ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ঐতিহাসিক সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই সেখানে এবার গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার একটি ছবি টানিয়েছেন বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা-কর্মীরা।
আজ সোমবার বেলা তিনটার দিকে ছাত্র ফেডারেশনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়ার নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী ছবিটি সংগ্রহশালায় টানান। যে স্থানে জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন করা হয়েছিল, তার ওপরেই ১৯৮১ সালে বায়তুল মোকাররমে গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার একটি ছবি লাগানো হয়।
ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়া বলেন, ডাকসুর ইতিহাস কোনো একক পক্ষের নয় এবং ইতিহাসকে একপক্ষীয়ভাবে উপস্থাপন করা গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর বক্তব্য, একাত্তরে গোলাম আযমের ভূমিকার প্রতিক্রিয়ায় পরবর্তী সময়ে তাঁকে ঘিরে যে জনরোষ তৈরি হয়েছিল, সেটিও দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ। সেই ইতিহাস তুলে ধরতেই ছবিটি সংগ্রহশালায় লাগানো হয়েছে।
অর্ক বড়ুয়া আরও বলেন, ডাকসুর পক্ষ থেকে জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ‘ইচ্ছা হয়েছে’ বলে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, একই যুক্তিতে তাঁরা গোলাম আযমকে জুতাপেটার ছবিটি সেখানে রেখেছেন।
সংস্কার শেষে গতকাল রোববার ডাকসুর ঐতিহাসিক সংগ্রহশালা আবার চালু করা হয়। এরপরই সংগ্রহশালায় থাকা বিভিন্ন ছবি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়।
নতুন প্রদর্শনীতে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে একটি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের একটি অনুষ্ঠানের ছবি। ওই অনুষ্ঠানে জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বক্তব্য দিয়েছিলেন।
এ ছাড়া ১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের একটি দলগত ছবিতেও জিন্নাহ রয়েছেন। আরেকটি হচ্ছে ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে জিন্নাহর ছবি-সংবলিত পাকিস্তানের ডন পত্রিকার প্রতিবেদনের পেপার কাটিং।
অন্যদিকে সংগ্রহশালায় বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একক বা গৌরবোজ্জ্বল ছবি না থাকার বিষয়টিও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভ জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষার্থী। তাঁদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতাকারী একজন নেতার ছবি ডাকসুর সংগ্রহশালায় কীভাবে স্থান পেল।
বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলও। সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি অভিযোগ করে, ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিকভাবে সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন করা হয়েছে। ছবিটি সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ডাকসুকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ প্রচারের জায়গা হিসেবে ব্যবহার না করার দাবি জানিয়েছে ছাত্রদল।
একই দিনে প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। সংগঠনটি জিন্নাহর ছবি সংযোজন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি অপসারণের প্রতিবাদ জানিয়ে দ্রুত জিন্নাহর ছবি সরানো ও শেখ মুজিবের ছবি পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে।
ফলে সংস্কার শেষে ডাকসু সংগ্রহশালা খুলে দেওয়ার পর সেখানে কোন ছবি থাকবে এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাস কীভাবে উপস্থাপন করা হবে—সেই প্রশ্নকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।



