ক্যারিয়ারের শেষপ্রান্তে এসে বয়স ও শারীরিক সমস্যার সঙ্গে লড়াইটা যেন আরও কঠিন হয়ে উঠছে নোভাক জোকোভিচের জন্য। ইউএস ওপেনের প্রথম রাউন্ডেই পাঁচ সেটের নাটকীয় লড়াইয়ে হেরে বিদায় নিয়েছেন ২৪টি গ্র্যান্ড স্ল্যামজয়ী সার্বিয়ান কিংবদন্তি। ম্যাচ শেষে কোর্ট ছাড়ার সময় নিজের আবেগও ধরে রাখতে পারেননি তিনি।
নিউইয়র্কের ফ্লাশিং মিডোসে আর্জেন্টিনার মারিয়ানো নাভোনের বিপক্ষে জোকোভিচ হেরেছেন ৭-৬ (৭-৫), ৫-৭, ৪-৬, ৬-২, ৬-১ গেমে। দীর্ঘ পাঁচ সেটের ম্যাচে একসময় ঘুরে দাঁড়ালেও শেষদিকে শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েন ৩৯ বছর বয়সী এই তারকা।
জোকোভিচের দীর্ঘ ইউএস ওপেন ক্যারিয়ারে প্রথম রাউন্ডে এটিই প্রথম হার। একই সঙ্গে ২০০৬ সালের পর এই প্রথম কোনো গ্র্যান্ড স্ল্যামের উদ্বোধনী রাউন্ড থেকেই বিদায় নিতে হলো তাঁকে।
চতুর্থ বাছাই হিসেবে টুর্নামেন্টে নামা জোকোভিচ শুরু থেকেই নিউইয়র্কের আর্দ্র আবহাওয়ায় অস্বস্তিতে ছিলেন। ম্যাচ যত এগিয়েছে, তাঁর শারীরিক সমস্যা ততই প্রকট হয়েছে। একপর্যায়ে তাঁকে বমি করতেও দেখা যায়। এরপর ক্র্যাম্প, পিঠ ও কাঁধের সমস্যায় তাঁর স্বাভাবিক খেলা ব্যাহত হয়।
তারপরও সহজে ম্যাচ ছাড়েননি জোকোভিচ। প্রথম সেট টাইব্রেকে হারলেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় সেট জিতে ম্যাচে এগিয়ে যান তিনি। কিন্তু চতুর্থ সেট থেকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকে।
শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া জোকোভিচের বিপক্ষে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেন ২৫ বছর বয়সী নাভোনে। চতুর্থ সেট ৬-২ গেমে জিতে ম্যাচে সমতা ফেরান আর্জেন্টাইন। এরপর সিদ্ধান্তমূলক পঞ্চম সেটে জোকোভিচ আর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেননি। ৬-১ গেমে সেট জিতে ক্যারিয়ারের স্মরণীয় জয় নিশ্চিত করেন নাভোনে।
ম্যাচ শেষে প্রতিপক্ষকে অভিনন্দন জানানোর সময় অবশ্য হাসিমুখেই ছিলেন জোকোভিচ। কিন্তু কোর্ট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে আবেগ আর ধরে রাখতে পারেননি। তাঁর চোখে অশ্রু দেখা যায়।
ম্যাচের পর নিজের শারীরিক অবস্থার কথা তুলে ধরেন জোকোভিচ। তিনি জানান, কোর্টে তাঁর অনুভূতি ভালো ছিল না। তবে নিজের অসুস্থতাকে সামনে এনে নাভোনের কৃতিত্ব ছোট করতে চান না তিনি। প্রতিপক্ষকে দারুণ লড়াকু হিসেবেও প্রশংসা করেন সার্বিয়ান তারকা।
জোকোভিচের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছর প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই একই ধরনের শারীরিক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন তিনি। বিশেষ করে বমির সমস্যা তাঁর জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরপর ক্র্যাম্প ও শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা শুরু হয়। নাভোনের বিপক্ষে ম্যাচের শেষদিকে পিঠ ও কাঁধও স্বাভাবিকভাবে কাজ করছিল না বলে জানান তিনি।
এই পরাজয়ের সঙ্গে আপাতত শেষ হয়ে গেল জোকোভিচের ২৫তম গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতে নতুন ইতিহাস গড়ার আরেকটি সুযোগ। তাঁর ঝুলিতে বর্তমানে ২৪টি গ্র্যান্ড স্ল্যাম একক শিরোপা রয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই সংখ্যায় তিনি অস্ট্রেলিয়ার মার্গারেট কোর্টের সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গ্র্যান্ড স্ল্যামজয়ীর অবস্থানে রয়েছেন।
এবারের ইউএস ওপেনের আগে জোকোভিচকে ঘিরে প্রত্যাশাও কম ছিল না। বিশ্বের এক নম্বর ইয়ানিক সিনার চোটের কারণে না থাকা এবং কার্লোস আলকারাজ দীর্ঘদিনের কবজির চোট কাটিয়ে ফেরায় অনেকেই মনে করেছিলেন, নিউইয়র্কে আরও একটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়ের বড় সুযোগ পেতে পারেন জোকোভিচ।
কিন্তু প্রথম রাউন্ডেই সেই সম্ভাবনার সমাপ্তি ঘটল। একই সঙ্গে নতুন করে সামনে এসেছে তাঁর বয়স ও ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন। ৩৯ বছর বয়সে সর্বোচ্চ পর্যায়ের টেনিসে দীর্ঘ পাঁচ সেটের ম্যাচে শরীর কতটা সঙ্গ দেবে, নাভোনের বিপক্ষে পরাজয়ের পর সেই আলোচনা আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এখনই অবসরের পথে হাঁটার ইঙ্গিত দেননি জোকোভিচ। আপাতত তাঁর লক্ষ্য দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা শারীরিক সমস্যার কারণ খুঁজে বের করা এবং সুস্থ হয়ে আবার প্রতিযোগিতামূলক টেনিসে ফেরা।
নিউইয়র্কের এই রাত তাই জোকোভিচের জন্য শুধুই একটি ম্যাচ হারার ঘটনা নয়। ২৫তম গ্র্যান্ড স্ল্যামের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হওয়ার পাশাপাশি তাঁর ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হলো নতুন প্রশ্ন। আর ফ্লাশিং মিডোসের কোর্ট থেকে চোখের জলে বিদায়ের দৃশ্যটি হয়ে থাকল এবারের ইউএস ওপেনের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত।


