আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারে নতুন সপ্তাহের শুরুতেই দেখা গেছে দুই ভিন্ন চিত্র। একদিকে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, অন্যদিকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত সোনার দাম বেড়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত বার্তা—এই তিনটি বিষয়ই বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা একদিকে তেলের বাজারে বিক্রির চাপ বাড়িয়েছেন, অন্যদিকে সোনার বাজারে ঝুঁকেছেন।
সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৫ শতাংশের বেশি কমে ৮৩ দশমিক ৩৩ ডলারে নেমে আসে। এই পতনের অন্যতম কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য। তিনি জানিয়েছেন, আপাতত ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা নেই। বরং তিনি আশা করছেন, খুব শিগগিরই দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হবে। ট্রাম্প আরও জানান, সোমবার ইরানের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। যদিও তিনি কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করেননি, তবুও তাঁর এই বক্তব্যে বাজারে যুদ্ধ-উত্তেজনা কিছুটা কমবে—এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগও কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। সাধারণত এই অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় এবং দাম বেড়ে যায়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ঝুঁকি আপাতত কমে আসায় বিনিয়োগকারীরা তেলের বাজারে বিক্রির দিকে ঝুঁকেছেন। এর ফলেই সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে অপরিশোধিত তেলের দামে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে।
অন্যদিকে একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বেড়েছে। গ্রিনিচ মান সময় ভোর ৪টা ৩৭ মিনিটে স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স সোনার দাম শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৬৮ দশমিক ৫৪ ডলার। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সোনার ফিউচার বাজারেও দাম শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৬৬ দশমিক ৬০ ডলারে পৌঁছায়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ডলারের দুর্বলতা সোনার দাম বাড়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এদিকে জাপানের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ ইয়েনের মান শক্তিশালী করতে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করেছে। এর ফলে মার্কিন ডলারের ওপর চাপ তৈরি হয় এবং ডলারের মূল্য কিছুটা দুর্বল হয়। যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম ডলারে নির্ধারিত হয়, তাই ডলার দুর্বল হলে অন্যান্য দেশের বিনিয়োগকারীদের জন্য সোনা তুলনামূলকভাবে সস্তা হয়ে যায়। এতে সোনার চাহিদা বৃদ্ধি পায় এবং দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়।
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেছেন, সপ্তাহের শুরুতে সোনার বাজার ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং তেলের বাজারের অনিশ্চয়তা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তাই সোনার দাম বাড়লেও তা খুব বেশি গতিতে বাড়বে—এমন সম্ভাবনা এখনই দেখা যাচ্ছে না। তাঁর মতে, বিনিয়োগকারীরা এখনো সতর্ক অবস্থানেই রয়েছেন এবং নতুন অর্থনৈতিক তথ্যের অপেক্ষায় আছেন।
বিশ্লেষকদের নজর এখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক তথ্যের দিকেও। চলতি সপ্তাহে দেশটির শ্রমবাজারসংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে। এর মধ্যে রয়েছে চাকরির শূন্য পদের তথ্য, এডিপির বেসরকারি কর্মসংস্থান প্রতিবেদন, সাপ্তাহিক বেকারত্ব ভাতার আবেদন এবং বহুল প্রত্যাশিত অকৃষি খাতের কর্মসংস্থান প্রতিবেদন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ভবিষ্যতে সুদের হার বাড়াবে কি না, সে বিষয়ে নতুন ধারণা পাওয়া যাবে।
টিম ওয়াটারারের মতে, যদি মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় এবং তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে অথবা যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান প্রতিবেদন প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী আসে, তাহলে সেপ্টেম্বরে ফেড সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা আরও জোরালো হবে। সে ক্ষেত্রে সোনার বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে। কারণ সুদের হার বেড়ে গেলে সুদবিহীন সম্পদ হিসেবে সোনার আকর্ষণ সাধারণত কমে যায়।
গত সপ্তাহে ফেডারেল রিজার্ভের নীতিনির্ধারণী বৈঠকের পর তিনজন কর্মকর্তা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে দ্রুত সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁদের মতে, যথাসময়ে সুদের হার সমন্বয় না করলে মূল্যস্ফীতি ফেডের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে দীর্ঘ সময় ধরে থাকতে পারে। এই অবস্থানও বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
এদিকে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, মৌসুমি চাহিদা বৃদ্ধির আগে স্বল্পমেয়াদে সোনার দাম আরও কিছুটা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। স্পট মার্কেটে রুপার দাম ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে আউন্সপ্রতি ৫৮ দশমিক ৪৬ ডলারে পৌঁছেছে। এছাড়া প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের দামও যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ এবং ১ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে আপাতত তেলের দামে স্বস্তি ফিরলেও সোনার বাজারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক তথ্য এবং ফেডারেল রিজার্ভের ভবিষ্যৎ নীতিগত সিদ্ধান্ত—এই তিনটি বিষয়ই আগামী দিনগুলোতে বিশ্ববাজারের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

