মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও গলফ মাঠে শিরোপা জয়ের দাবি করে আলোচনায় উঠে এসেছেন। তবে এবার শুধু জয়ের জন্য নয়, প্রতিদ্বন্দ্বীদের উদ্দেশে দেওয়া আত্মবিশ্বাসী এবং রসিকতাপূর্ণ মন্তব্যও ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক ভিডিও প্রকাশ করে ট্রাম্প বলেছেন, “এটার নাম ট্যালেন্ট। আমার আছে, ওদের নেই।” তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে সমর্থকদের পাশাপাশি সমালোচকদের মধ্যেও নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।
রোববার যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির বেডমিনস্টারে অবস্থিত নিজের মালিকানাধীন ট্রাম্প ন্যাশনাল গলফ ক্লাবে অনুষ্ঠিত ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপে সিনিয়র ও সুপার সিনিয়র—উভয় বিভাগেই বিজয়ী হওয়ার দাবি করেন ট্রাম্প। প্রতিযোগিতা শেষে প্রকাশ করা ভিডিওতে তিনি জানান, পারের তুলনায় দুই শট কম খেলে ৭০ স্কোর করে শিরোপা নিশ্চিত করেছেন। পোস্টে ট্রাম্প আরও লিখেছেন, অন্য প্রতিযোগীদের মতো অনুশীলনের জন্য তাঁর খুব বেশি সময় থাকে না, কারণ রাষ্ট্র পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনেই তাঁর অধিকাংশ সময় ব্যয় হয়। তারপরও জয়ের পেছনে নিজের ‘প্রাকৃতিক প্রতিভা’কেই সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
ভিডিওতে দেখা যায়, শট নেওয়ার আগে কয়েকবার অনুশীলনী সুইং করেন ট্রাম্প। এরপর বলটি নিখুঁতভাবে গ্রিনে গিয়ে থামে। পরে আরেকটি ভিডিওতে তাঁকে ট্রফি গ্রহণ করতে এবং উপস্থিত দর্শকদের শুভেচ্ছা গ্রহণ করতে দেখা যায়। আয়োজকদের দাবি অনুযায়ী, এটি ট্রাম্পের ৪৩তম ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপা। এই প্রতিযোগিতায় সাধারণত ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সী খেলোয়াড়রা সিনিয়র বিভাগে এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সীরা সুপার সিনিয়র বিভাগে অংশ নেন। বর্তমানে ৮০ বছর বয়সী ট্রাম্প এর আগেও একাধিকবার এই প্রতিযোগিতায় সাফল্য পেয়েছেন। ২০২৩ সালে তিনি একই সঙ্গে দুই বিভাগেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দাবি করেছিলেন। পরের বছরও সিনিয়র বিভাগের শিরোপা জয়ের কথা জানিয়েছিলেন তিনি।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের গলফপ্রেম বহুদিনের। প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগেও এবং দায়িত্ব পালনকালেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাঁর মালিকানাধীন একাধিক গলফ কোর্সে নিয়মিত খেলতে দেখা গেছে তাঁকে। ব্যস্ত রাজনৈতিক সূচির মধ্যেও সুযোগ পেলেই তিনি গলফ খেলেন। সমর্থকদের মতে, গলফ শুধু তাঁর ব্যক্তিগত শখ নয়, বরং ব্যবসায়িক পরিচয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যুক্তরাষ্ট্র, স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে তাঁর নামে একাধিক গলফ রিসোর্ট রয়েছে, যেগুলো আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছেও পরিচিত।
তবে গলফে ট্রাম্পের সাফল্যের পাশাপাশি বিতর্কও বরাবরই তাঁর সঙ্গী হয়েছে। গত কয়েক বছরে একাধিকবার তাঁর বিরুদ্ধে খেলায় অসাধু সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মার্কিন ক্রীড়া লেখক রিক রাইলি তাঁর ‘Commander in Cheat’ বইয়ে ট্রাম্পের গলফ খেলা নিয়ে নানা বিতর্কিত ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। বইটিতে দাবি করা হয়েছে, ট্রাম্প নাকি বিভিন্ন সময় নিজের স্কোর উন্নত দেখাতে নিয়ম ভেঙেছেন বা সুবিধা নিয়েছেন। যদিও এসব অভিযোগের কোনোটি আদালতে প্রমাণিত হয়নি এবং ট্রাম্প বরাবরই সেগুলো অস্বীকার করেছেন।
শুধু লেখকই নন, হলিউড অভিনেতা স্যামুয়েল এল. জ্যাকসন-ও অতীতে প্রকাশ্যে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে গলফে প্রতারণার অভিযোগ তুলেছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, ট্রাম্প প্রতিযোগিতামূলক খেলায় নিয়ম না মেনেই নিজের সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করতেন। তবে ট্রাম্প এসব মন্তব্যকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, প্রতিপক্ষরা তাঁর জনপ্রিয়তা ও সাফল্য মেনে নিতে না পেরেই এমন অভিযোগ করছেন।
এদিকে ট্রাম্পের সর্বশেষ মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সমর্থকদের অনেকেই তাঁর আত্মবিশ্বাসকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন এবং বলছেন, এটি ট্রাম্পের স্বভাবসুলভ রসবোধেরই প্রকাশ। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে এমন মন্তব্য অহংকারের বহিঃপ্রকাশ এবং এটি অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি করে। বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বীদের উদ্দেশে “আমার আছে, ওদের নেই” ধরনের মন্তব্যকে অনেকেই ক্রীড়াসুলভ মনোভাবের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও উল্লেখ করেছেন।
গলফে ট্রাম্পের নতুন এই শিরোপা তাঁর দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সাফল্যের তালিকায় আরেকটি সংযোজন হলেও, তা আবারও তাঁকে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। একদিকে নিজের দক্ষতার প্রশংসা, অন্যদিকে পুরোনো প্রতারণার অভিযোগ—দুই বিপরীত আলোচনাই এখন সমানভাবে সামনে এসেছে। ফলে গলফের এই বিজয় কেবল একটি ক্রীড়া অর্জনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ট্রাম্পের ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস এবং তাঁকে ঘিরে চলমান বিতর্কের নতুন অধ্যায় হিসেবেও আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে।

