অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডারউইন টেস্টের প্রথম দিনটা বাংলাদেশের ক্রিকেটে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কারণ, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের কোনো বোলার এক ইনিংসে পাঁচের বেশি উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়েছেন। আর সেই ইতিহাসের নায়ক ২৬ বছর বয়সী পেসার হাসান মাহমুদ।
ডারউইন টেস্টের প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট করেছে বাংলাদেশ। আর এই দুর্দান্ত বোলিংয়ের নেতৃত্ব দিয়েছেন হাসান। একে একে ছয়জন অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানকে সাজঘরে ফিরিয়েছেন তিনি। শুরুটা করেছিলেন ওপেনার জেক ওয়েদারাল্ডকে দিয়ে, আর অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের শেষ উইকেট হিসেবে ফিরিয়েছেন নাথান লায়নকে।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের কোনো বোলারের এতদিন পাঁচ উইকেটও ছিল না। সেই জায়গায় হাসানের ছয় উইকেট শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের জন্যও বড় এক মাইলফলক।
তবে ছয়টি উইকেটের মধ্যে কোনটি তাঁর কাছে সবচেয়ে বেশি ‘স্পেশাল’—দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় হাসান মাহমুদকে।
শুরুতে অবশ্য কোনো একটি উইকেটকে আলাদা করে গুরুত্ব দিতে চাননি তিনি। হাসানের ভাষায়, সব উইকেটই তাঁর কাছে সমান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের পছন্দের উইকেটের কথা বলতেই হলো তাঁকে।
আর সেখানে তিনি বেছে নিলেন অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান স্টিভ স্মিথের উইকেট।
কেন স্মিথের উইকেট এতটা বিশেষ?
হাসানের ব্যাখ্যা, স্মিথ তাঁর বলের ধরন অনুমান করতে পারছিলেন না। দুবার জীবন পাওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত হাসানের বোলিংয়ের ফাঁদে পড়ে সাজঘরে ফিরতে হয়েছে স্মিথকে।
স্মিথ উইকেট ছেড়ে বেরিয়ে এসে আক্রমণাত্মক শট খেলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হাসানের পরিকল্পনা ছিল অন্যরকম। তাঁর অনুমান ছিল, স্মিথ কিছু একটা করার চেষ্টা করবেন। সেই মুহূর্তে বাউন্সার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বাংলাদেশের এই পেসার।
সেই বাউন্সারেই সফল হন হাসান।
তিনি বলেন, তাঁর ‘ইনস্টিঙ্কট’ বা সহজাত অনুমান বলছিল স্মিথ কিছু একটা করতে যাচ্ছেন। তাই বাউন্সার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। স্মিথ সেই বল ঠিকভাবে খেলতে পারেননি।
এই উইকেটের মধ্যেই যেন হাসানের বোলিং বুদ্ধিমত্তার একটা বড় দিক ফুটে উঠেছে। শুধু গতি বা সুইং নয়, ব্যাটসম্যানের মানসিকতা বুঝে বল করার দক্ষতাও কাজে লাগিয়েছেন তিনি।
আর হাসানের এমন পারফরম্যান্সে শুধু বাংলাদেশের সতীর্থরাই নন, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটাররাও প্রশংসা করেছেন।
হাসান জানিয়েছেন, ম্যাচের মধ্যে ট্রাভিস হেড তাঁর বোলিংয়ের প্রশংসা করেছেন। এমনকি নাথান লায়নও তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানতে চেয়েছেন, হাসানের এর আগে কয়টি পাঁচ উইকেটের কীর্তি আছে।
অবশ্য হাসানের এই সাফল্যের পেছনে একক কোনো বোলারের অবদান ছিল না। ডারউইনের প্রথম দিন বাংলাদেশের তিন পেসারই দারুণ পারফর্ম করেছেন।
হাসান মাহমুদ নিয়েছেন ছয় উইকেট। তাসকিন আহমেদ ও ইবাদত হোসেন নিয়েছেন দুটি করে উইকেট। অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের ১০টি উইকেটই নিয়েছেন বাংলাদেশের পেসাররা।
টেস্ট ক্রিকেটে এক ইনিংসে বাংলাদেশের পেসারদের ১০ উইকেট নেওয়ার ঘটনা এর আগে মাত্র একবার ঘটেছিল। ডারউইনে আবারও সেই কীর্তির পুনরাবৃত্তি হলো।
অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে এমন বোলিংয়ের পেছনে প্রস্তুতির কথাও বলেছেন হাসান। তাঁর মতে, দলের প্রস্তুতি ভালো ছিল এবং বোলাররা অনুশীলনের জন্য যথেষ্ট সময় পেয়েছেন।
বিশ্বের অন্যতম সেরা দলের বিপক্ষে বোলিং করাটা যে কঠিন, সেটিও স্বীকার করেছেন তিনি। তবে তাসকিন ও ইবাদত এক প্রান্ত থেকে যেভাবে চাপ তৈরি করেছেন, সেটিই তাঁকে অন্য প্রান্ত থেকে আক্রমণাত্মক বোলিং করার সুযোগ দিয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য দিনের সবচেয়ে বড় স্বস্তি অবশ্য শুধু অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে আটকে দেওয়া নয়। ব্যাট হাতেও দারুণ শুরু করেছে দল।
অস্ট্রেলিয়ার ১৯৮ রানের জবাবে প্রথম দিন শেষে বাংলাদেশ ১ উইকেট হারিয়ে করেছে ৯৬ রান। অর্থাৎ হাতে রয়েছে ৯ উইকেট, আর অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের রান থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে মাত্র ১০২ রানে।
বাংলাদেশের ওপেনার সাদমান ইসলাম অবশ্য দিনের শেষ পর্যন্ত থাকতে পারেননি। তবে এরপর যে জুটি তৈরি হয়েছে, সেটি বড় স্কোরের ভিত্তি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন হাসান মাহমুদ।
তাঁর প্রত্যাশা, দ্বিতীয় দিন ব্যাটসম্যানরা এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবেন। বড় স্কোর গড়ে অস্ট্রেলিয়ার ওপর চাপ তৈরি করাই এখন বাংলাদেশের লক্ষ্য।
সব মিলিয়ে ডারউইন টেস্টের প্রথম দিনটা বাংলাদেশের জন্য স্বপ্নের মতোই কেটেছে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২৩ বছর পর টেস্ট খেলতে নেমে শুরুতেই স্বাগতিকদের ১৯৮ রানে অলআউট করা, তিন পেসারের দুর্দান্ত বোলিং এবং এরপর ব্যাটিংয়ে ভালো শুরু—সবকিছু মিলিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণে থাকার সুযোগ তৈরি করেছে বাংলাদেশ।
আর এই দিনের সবচেয়ে বড় নায়ক হাসান মাহমুদ। ছয় উইকেট নিয়ে তিনি শুধু নিজের ক্যারিয়ারেই নতুন অধ্যায় যোগ করেননি, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের বোলিং ইতিহাসেও নিজের নাম লিখিয়েছেন। এখন তাঁর সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ—দ্বিতীয় দিন ব্যাটসম্যানরা সেই লড়াই কতটা এগিয়ে নিতে পারেন, সেটাই দেখার বিষয়।

