দেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বড় একটি অংশ দীর্ঘ সময় ধরে চাকরির অপেক্ষায় থাকছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ বলছে, স্নাতক ডিগ্রিধারী চাকরিপ্রত্যাশী তরুণদের প্রতি তিনজনের একজনকে এক বছরের বেশি সময় বেকার থাকতে হচ্ছে। চাকরির বাজারে অভিজ্ঞতার চাহিদা, নতুন কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ এবং দক্ষতার ঘাটতি—সব মিলিয়ে তরুণদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক শেষ করেছেন ফারহান তৌসিফ। এক বছরের বেশি সময় ধরে চাকরি খুঁজছেন তিনি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত আবেদন করলেও এখনো মনমতো চাকরি পাননি। ঢাকায় বন্ধুদের সঙ্গে মেসে থেকে টিউশনি করে নিজের খরচ চালাচ্ছেন।
ফারহানের অভিজ্ঞতা অনেক তরুণের বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। প্রতি মাসে একাধিক চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে আবেদন করলেও কোথাও ডাক আসে, কোথাও আবার আসে না। আর ডাক পেলেও শেষ পর্যন্ত নিয়োগ হয় না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ চাকরিতে অভিজ্ঞতা চাওয়ায় নতুন স্নাতকদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
আজ বুধবার আন্তর্জাতিক যুব দিবস। জাতিসংঘের উদ্যোগে বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এমন একটি দিনে বাংলাদেশের তরুণদের কর্মসংস্থানের চিত্র সামনে আনলে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষিতদের জন্য চাকরির অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন গত মাসে প্রকাশিত হয়েছে। সেই তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীর সংখ্যা ২০ লাখ ৩২ হাজার। অর্থাৎ মোট বেকারের বড় অংশই তরুণ।
এই তরুণ বেকারদের মধ্যে প্রায় ২৯ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত বা স্নাতক ডিগ্রিধারী। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ক্ষেত্রে শুধু বেকারের সংখ্যা নয়, চাকরি পাওয়ার জন্য অপেক্ষার সময়ও উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দীর্ঘ হচ্ছে চাকরির অপেক্ষা
বিবিএসের তথ্য বলছে, চাকরিপ্রত্যাশী উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ১৭ শতাংশের বেশি দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বেকার। আর ১ থেকে ২ বছর ধরে চাকরি খুঁজছেন ১৫ শতাংশের বেশি উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণী।
এই দুই হিসাব একসঙ্গে ধরলে দেখা যায়, স্নাতক ডিগ্রিধারী চাকরিপ্রত্যাশীদের প্রতি তিনজনের একজনের বেকারত্বের সময় এক বছরের বেশি।
অন্যদিকে, সব ধরনের তরুণ বেকারের মধ্যে ২৭ শতাংশের বেশি এক থেকে তিন মাসের মধ্যে চাকরি বা কাজের সুযোগের সন্ধানে থাকেন। আবার ৮ শতাংশের মতো তরুণকে দুই বছরের বেশি সময় ধরে কাজ খুঁজতে হয়।
শিক্ষিত ও কম শিক্ষিত বেকারদের মধ্যে এই পার্থক্যের একটি কারণও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তুলনামূলক কম শিক্ষিত ব্যক্তিরা যেকোনো ধরনের কাজ পেলে তাতে যুক্ত হয়ে যান। কিন্তু উচ্চশিক্ষিত তরুণদের অনেকেই তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চাকরি পাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন।
অনলাইনে বাড়ছে চাকরি খোঁজার প্রবণতা
চাকরি খোঁজার পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এসেছে। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে অনলাইন চাকরির প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বাড়ছে। দেশের অন্যতম বড় চাকরি খোঁজার প্ল্যাটফর্ম বিডিজবস ডটকমে এখন প্রায় ৫০ লাখ চাকরিপ্রত্যাশীর প্রোফাইল রয়েছে।
প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই লাখ চাকরিপ্রত্যাশী প্ল্যাটফর্মটিতে প্রবেশ করে নিজেদের পছন্দের চাকরি খোঁজেন। দুই বছর আগে এই সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় লাখ। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে চাকরি খোঁজা মানুষের দৈনিক উপস্থিতি বেড়েছে ৩৩ শতাংশের বেশি।
প্ল্যাটফর্মটিতে সব সময় ছয় থেকে সাত হাজারের মতো চাকরির সুযোগ দেখা যায়। প্রতি মাসে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ১০ হাজার নতুন চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।
বিডিজবস ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফাহিম মাশরুরের মতে, নতুন স্নাতকদের জন্য চাকরির বাজারে সুযোগ তুলনামূলক কম। কারণ, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় একটি অংশ অভিজ্ঞ কর্মী চায়। ফলে সদ্য স্নাতকদের চাকরিতে প্রবেশের পথ কঠিন হয়ে পড়ছে।
বেকার তরুণের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি
বিবিএসের হিসাবে, দেশের শ্রমবাজারে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীর সংখ্যা ২ কোটি ৪৮ লাখ। তাঁদের মধ্যে ২ কোটি ২৮ লাখের মতো কাজ করছেন। বাকি ২০ লাখ ৩২ হাজার তরুণ-তরুণী বেকার।
দেশের মোট বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ৭৬ শতাংশই তরুণ। আবার মোট বেকারের প্রায় ২৯ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত। সংখ্যার হিসাবে দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার।
বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ-তরুণী শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। কিন্তু সেই তুলনায় পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগও পর্যাপ্ত নয়।
আরেকটি সমস্যা হলো দক্ষতার ঘাটতি। যে ধরনের চাকরি বা শোভন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে সেই চাকরির প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিয়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে পারছেন না তরুণদের একটি অংশ। ফলে একদিকে চাকরির সুযোগ সীমিত, অন্যদিকে চাকরির বাজারের চাহিদা ও চাকরিপ্রার্থীদের দক্ষতার মধ্যে তৈরি হচ্ছে ব্যবধান।
বেকারত্বের হিসাবেও রয়েছে বাস্তবতার ফারাক
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, কেউ যদি সপ্তাহে মাত্র এক ঘণ্টা মজুরির বিনিময়ে কাজ করেন, তাহলে তাঁকে বেকার হিসেবে গণ্য করা হয় না। যিনি কাজ করতে আগ্রহী, কাজ খুঁজছেন এবং সর্বশেষ এক সপ্তাহে এক ঘণ্টাও মজুরির বিনিময়ে কাজের সুযোগ পাননি, তাঁকেই বেকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় সপ্তাহে মাত্র এক ঘণ্টা কাজ করে জীবনধারণ সম্ভব নয়। ফলে সরকারি হিসাবে বেকার না হলেও অনেক মানুষ পর্যাপ্ত কাজ বা আয় থেকে বঞ্চিত। এমন মানুষকে অনেক সময় ছদ্মবেকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মনমতো বা পর্যাপ্ত কাজ না পাওয়া এমন মানুষের সংখ্যা প্রায় এক কোটি।
ফলে আন্তর্জাতিক যুব দিবসে তরুণদের কর্মসংস্থানের প্রশ্নটি শুধু বেকারের সংখ্যা দিয়ে দেখার সুযোগ নেই। উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর দীর্ঘ সময় চাকরির অপেক্ষা, অভিজ্ঞতার চাহিদা, দক্ষতার ঘাটতি এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব—সব মিলিয়ে দেশের তরুণ শ্রমশক্তির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

