মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দেবে কি না—এ নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তাঁর বক্তব্য, এ ধরনের কোনো চুক্তিতে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের একান্ত নিজস্ব বিষয়। দেশের প্রয়োজন ও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত নিলে তা নিয়ে অন্য কারও উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।
বৃহস্পতিবার দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে চলমান আলোচনার বিষয়ে মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান।
পোস্টে তিনি বলেন, ‘মক্কা প্যাক্টে যোগদান বাংলাদেশের একান্ত নিজস্ব বিষয়। দেশ ও জাতির প্রয়োজন এবং স্বার্থে বাংলাদেশ কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তাতে অন্য কারও শ্বাসকষ্টে ভোগার প্রয়োজন নেই।’
জামায়াত আমিরের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে, এই প্রতিরক্ষা কাঠামোয় অংশগ্রহণের বিষয়ে বাংলাদেশ ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে আগ্রহের কথা প্রকাশ্যে জানানো হয়েছে।
গত ২৪ আগস্ট পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এই চুক্তির বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশকে এখন গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং নতুন ধরনের সহযোগিতামূলক উদ্যোগে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের মানুষের কাছে মক্কার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি হলে সেখানে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে তিনি জানান, সরকার বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে এবং ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয় গত ৭ আগস্ট। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান এই চুক্তিতে সই করে। চুক্তিটির ঘোষিত লক্ষ্য হচ্ছে সম্ভাব্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সদস্যদেশগুলোর যৌথ প্রতিরোধ সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা।
চুক্তি নিয়ে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সদস্য তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ফলে এটি শুধু সাধারণ সামরিক সহযোগিতার কাঠামো নয়; বরং পারস্পরিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতির বিষয়টিও এতে যুক্ত হয়েছে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ চুক্তিটিতে যোগ দিলে দেশের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতিতে এর প্রভাব কী হতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তির সদস্য হয়নি। সরকারের বক্তব্যেও মূলত আগ্রহ ও ইতিবাচক মনোভাবের কথাই উঠে এসেছে।
অন্যদিকে চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণকে ঘিরে আঞ্চলিক পর্যায়েও আলোচনা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শফিকুর রহমানের বক্তব্যের মূল বার্তা হলো—বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হওয়া উচিত এবং সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা বাংলাদেশের রয়েছে।
জামায়াত আমিরের বক্তব্যে ‘অন্য কারও শ্বাসকষ্টে ভোগার প্রয়োজন নেই’ মন্তব্যটিও বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। সরাসরি কোনো দেশ বা পক্ষের নাম উল্লেখ না করলেও তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এখন নজর থাকবে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। কারণ আগ্রহ প্রকাশ করা এবং আনুষ্ঠানিকভাবে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যোগ দেওয়া এক বিষয় নয়। এ ধরনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক, জাতীয় নিরাপত্তা, সামরিক সহযোগিতা এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক ভূরাজনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত।
ফলে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত যোগ দেয় কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। তবে সেই আলোচনা চলার মধ্যেই জামায়াত আমির শফিকুর রহমান স্পষ্ট করে দিলেন তাঁর অবস্থান—জাতীয় প্রয়োজন ও স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার বাংলাদেশের, আর সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্য কোনো পক্ষের অস্বস্তির প্রয়োজন নেই।

