মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার একটি পরীক্ষা কেন্দ্রে পাঠ্যবই খুলে উত্তর লেখার দৃশ্য ভিডিও করতে গিয়ে দুই সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের দাবি, পরীক্ষা চলাকালে নকলের দৃশ্য ধারণ করার সময় শিক্ষক ও পরীক্ষার্থীদের একাংশ তাঁদের মারধর করেন, মুঠোফোন ও সম্প্রচার সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেন এবং একটি কক্ষে আটকে রাখেন। তবে অভিযুক্ত এক শিক্ষক হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে উল্টো সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ তুলেছেন।
ঘটনাটি ঘটেছে শুক্রবার সকালে গাংনী উপজেলার কাজীপুর ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে। সেখানে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএ ও বিএসএস প্রথম বর্ষের ইংরেজি বিষয়ের পরীক্ষা চলছিল।
হামলার অভিযোগ করা দুই সাংবাদিক হলেন বাংলাদেশ বেতার ও নাগরিক টেলিভিশনের মেহেরপুর জেলা প্রতিনিধি রাব্বি আহমেদ এবং দৈনিক খবরের কাগজের জেলা প্রতিনিধি তারেক হোসেন। ঘটনার পর তাঁরা গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।
সাংবাদিক রাব্বি আহমেদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকালে তাঁরা কাজীপুর ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে দেখতে পান, শিক্ষকদের উপস্থিতিতেই কয়েকজন পরীক্ষার্থী পাঠ্যবই দেখে উত্তর লিখছেন। তাঁরা বিষয়টি মুঠোফোনে ভিডিও করতে শুরু করেন।
তাঁর অভিযোগ, ভিডিও ধারণের সময় কলেজের শিক্ষক মনিরুজ্জামান বিপ্লবসহ দুজন শিক্ষক তাঁদের ওপর হামলা চালান।
অন্যদিকে সাংবাদিক তারেক হোসেন বলেন, কিছুদিন ধরেই বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএ ও বিএসএস পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীদের বই দেখে উত্তর লেখার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে—এমন অভিযোগ তাঁরা পাচ্ছিলেন।
সেই তথ্যের ভিত্তিতেই তাঁরা পরীক্ষা কেন্দ্রে যান। সেখানে গিয়ে বই দেখে লেখার দৃশ্য দেখতে পাওয়ার পর ভিডিও ধারণ শুরু করলে তাঁদের বাধা দেওয়া হয়। একপর্যায়ে মারধর করে একটি কক্ষে আটকে রাখা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরে তাঁদের সেখান থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তবে সাংবাদিকদের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শিক্ষক মনিরুজ্জামান বিপ্লব। তাঁর দাবি, ওই দুই সাংবাদিক মুঠোফোনে তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করেছিলেন। টাকা না দিলে কলেজের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মনিরুজ্জামান বিপ্লবের ভাষ্য, তাঁদের দাবি আমলে না নেওয়ায় সাংবাদিকেরা পরীক্ষা কেন্দ্রে এসে মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ শুরু করেন। তবে সাংবাদিকদের মারধরের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন।
শিক্ষকের তোলা চাঁদা দাবির পাল্টা অভিযোগও অস্বীকার করেছেন সাংবাদিক তারেক হোসেন। তাঁর দাবি, পরীক্ষায় নকলের অভিযোগের খবর পেয়েই তাঁরা পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য সেখানে গিয়েছিলেন।
ঘটনাটি সামনে আসার পর মেহেরপুরের সাংবাদিকদের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। মেহেরপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি ফারুক হোসেন সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে এবং অভিযোগের যথাযথ তদন্ত হবে।
এদিকে ঘটনার পর শুক্রবার সন্ধ্যায় সাংবাদিক রাব্বি আহমেদ বাদী হয়ে গাংনী থানায় একটি মামলা করেছেন।
গাংনী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাদ্দিদ মোর্শেদ চৌধুরী জানিয়েছেন, অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। হামলার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, তাঁদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি ছিনিয়ে নেওয়া মুঠোফোন ও অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধারের জন্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ঘটনাটিতে এখন দুটি পাল্টাপাল্টি অভিযোগ সামনে এসেছে। সাংবাদিকদের দাবি, পরীক্ষায় বই দেখে লেখার দৃশ্য ধারণ করায় তাঁদের ওপর হামলা হয়েছে। অন্যদিকে অভিযুক্ত শিক্ষকের দাবি, এর আগে সাংবাদিকেরা তাঁর কাছে চাঁদা চেয়েছিলেন এবং কোনো মারধরের ঘটনা ঘটেনি।
ফলে প্রকৃতপক্ষে পরীক্ষা কেন্দ্রে কী ঘটেছিল এবং নকলের অভিযোগের পাশাপাশি সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও চাঁদা দাবির পাল্টা অভিযোগের সত্যতা কতটা—তা এখন তদন্তের বিষয়। পুলিশের তদন্তের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেও নজর থাকবে।

