মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি শেষ হলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে ব্যাপক অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন হবে। আর সেই পুনর্গঠন কার্যক্রমে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের চাহিদা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে সরকার। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন শ্রমবাজার খোঁজা এবং অভিবাসনের সুযোগ বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের প্রশ্নের লিখিত জবাবে এ তথ্য জানান প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে সংসদে প্রশ্নের উত্তর দেন প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক।
বেলা তিনটায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের দিনের কার্যসূচি শুরু হয়। নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে এসব তথ্য টেবিলে উত্থাপন করা হয়।
সরকারের ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও যুদ্ধের কারণে যেসব দেশের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সেখানে পুনর্নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হবে। ফলে নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে বিদেশি শ্রমিকের প্রয়োজন বাড়তে পারে। এই সম্ভাব্য শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশের সুযোগ তৈরির দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে।
একই দিনে সংসদে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়েও কথা বলেন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি মালয়েশিয়া সফর করেছেন। এরপর জুলাইয়ের শেষ দিকে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও মন্ত্রীও দেশটি সফর করেন।
এসব সফরের ধারাবাহিকতায় খুব দ্রুত মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর পথ সুগম হবে বলে আশা করছে সরকার।
বিদেশে বাংলাদেশি কর্মীদের যাওয়ার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও সংসদে তুলে ধরা হয়। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনির প্রশ্নের জবাবে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, গত অর্থবছরে চাকরির উদ্দেশ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গেছেন ৯ লাখ ৮৫ হাজার ১২০ জন বাংলাদেশি।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মী গেছেন সৌদি আরবে। দেশটিতে গেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬২ জন। কাতারে গেছেন ৮৯ হাজার ২৩ জন, সিঙ্গাপুরে ৭৫ হাজার ৪১ জন, মালদ্বীপে ৪২ হাজার ১৩০ জন এবং কুয়েতে গেছেন ৩৯ হাজার ৮৭৫ জন বাংলাদেশি কর্মী।
সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে দুর্যোগ পরিস্থিতি নিয়েও বেশ কিছু তথ্য উঠে আসে। কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালামের প্রশ্নের লিখিত জবাবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানান, ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। দেশে প্রতিবছর গড়ে ৩৬৫ জন বজ্রপাতে প্রাণ হারান।
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মোহাম্মদ সালমান ওমরের প্রশ্নের জবাবে জানানো হয়, চলতি বছরে এ পর্যন্ত দেশের ৪৬ জেলায় বজ্রপাতে ১৬১ জন নিহত এবং ৫৫ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে চার জেলায় পাহাড়ধসে ২৭ জনের মৃত্যু এবং ৫২ জন আহত হয়েছেন।
মে মাসে ভারী বৃষ্টির কারণে হাওর অঞ্চলের সাত জেলায় কৃষি ও ফসলের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৮৮ কোটি ৬৮ লাখ ৩৯ হাজার ১৫৪ টাকা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে এসব প্রশ্নের উত্তর দেন প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন।
ভূমিকম্প মোকাবিলার প্রস্তুতির বিষয়েও সংসদে তথ্য দেওয়া হয়। নিলুফার চৌধুরী মনির সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এক লাখ স্বেচ্ছাসেবকের একটি ভিত্তি গড়ে তোলার কাজ চলছে। ইতিমধ্যে ৭০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন দুর্যোগের পর উদ্ধারকাজ পরিচালনায় সক্ষম করে তোলা হচ্ছে।
সরকার দুর্যোগ মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্ধার সরঞ্জামও কিনেছে। এসব সরঞ্জাম সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও আনসারসহ সরাসরি উদ্ধারকাজে যুক্ত বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। আরও সরঞ্জাম কেনার জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে থাকা উদ্ধার সরঞ্জামের তালিকাও তৈরি করা হয়েছে, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে সেগুলো কাজে লাগানো যায়।
এদিকে প্রশ্নোত্তর পর্বে কিছুটা হাস্যরসেরও সৃষ্টি হয়। জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত সংসদ সদস্য জি এম নজরুল ইসলামকে তাঁর তারকা চিহ্নিত প্রশ্ন উত্থাপনের জন্য ডাকেন স্পিকার। কিন্তু তাঁকে আসনে দেখতে না পেয়ে স্পিকার বলেন, ‘জি এম তো নাই’। এ মন্তব্যে সংসদকক্ষে হাসির সৃষ্টি হয়।
অনুপস্থিত থাকায় জি এম নজরুল ইসলামের প্রশ্নটি আর আলোচিত হয়নি। তাঁর লিখিত প্রশ্নের প্রস্তুত করা উত্তরে অবশ্য জানানো হয়েছিল, দেশে বর্তমানে একটি শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনাল ও ১৪টি শ্রম আদালতসহ মোট ১৫টি শ্রম আদালত কার্যকর রয়েছে। গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত এসব আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ২৯ হাজার ৯২৭।
তবে দিনের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রবাসী কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছিল মধ্যপ্রাচ্যের সম্ভাব্য নতুন সুযোগ। যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন কার্যক্রমে শ্রমিকের চাহিদা বাড়লে সেই বাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মালয়েশিয়াসহ প্রচলিত ও নতুন শ্রমবাজার সম্প্রসারণে সরকার এখন থেকেই উদ্যোগ নিচ্ছে বলে সংসদে জানানো হয়েছে।

