জনভোগান্তি নিরসন ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চ করতে যাচ্ছে বিরোধী জোট ১১–দলীয় ঐক্য। কর্মসূচিতে পাঁচ থেকে ছয় হাজার গাড়ি নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও দেশে চলমান জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে এক হাজারে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
আগামী ৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে শুরু হয়ে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে গিয়ে শেষ হবে এই লংমার্চ।
কর্মসূচি সামনে রেখে বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর বাংলামোটরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরে সংবাদ সম্মেলনে লংমার্চের রুট, পথসভা, যানবাহনের সংখ্যা ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত তুলে ধরেন দলটির নেতারা।
এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, জনভোগান্তি নিরসন এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই তাঁরা এই লংমার্চ করছেন। তাঁর অভিযোগ, গত ছয় মাসে সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে পারেনি। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সারের সরবরাহ এবং নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণেও সরকার প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি।
অতীতের জুলুম-নির্যাতনের বিচারও ফলপ্রসূ পর্যায়ে নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। আখতার হোসেনের দাবি, জনগণের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বিরোধীরা সংসদে কথা বললেও সরকার সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে না।
জ্বালানি খাতেও সরকার ‘চূড়ান্ত ব্যর্থতার’ পরিচয় দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন এনসিপির সদস্যসচিব। একই সঙ্গে ছিনতাই, খুনসহ বিভিন্ন অপরাধের কথা উল্লেখ করে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ এবং গুম প্রতিরোধ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসংক্রান্ত আইনি পদক্ষেপ নিয়েও আপত্তি জানান আখতার।
তিনি বলেন, সার, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ জনগণের বিভিন্ন সমস্যা সরকারের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে বিরোধীরা। কিন্তু সেগুলো গুরুত্ব না পাওয়ায় এবার ১১–দলীয় ঐক্য সরাসরি জনগণের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে লংমার্চ কর্মসূচি ঘোষণা করলেও সরকারকে এখনো সময় দিতে প্রস্তুত বলে জানান আখতার হোসেন। তাঁর ভাষ্য, সেই সময় সরকারকে জনগণের কল্যাণে কাজে লাগাতে হবে। জনগণের দাবি, গণভোটের রায়, দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সরকারের প্রতি মানুষের অসন্তোষ আরও বাড়বে।
লংমার্চের বিস্তারিত রুট তুলে ধরেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি জানান, ৫ সেপ্টেম্বর সকাল সাতটায় শাপলা চত্বর থেকে কর্মসূচি শুরু হবে। সকাল সাতটা থেকে আটটা পর্যন্ত সেখানে উদ্বোধনী পথসভায় ১১ দলের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেবেন।
এরপর সকাল নয়টার দিকে লংমার্চ পৌঁছাবে সিদ্ধিরগঞ্জের চট্টগ্রাম রোড ট্রাকস্ট্যান্ডে। সেখানে প্রথম পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। দুপুর ১২টার দিকে কুমিল্লার নূরজাহান হোটেলের বিপরীত পাশের খালি জায়গায় আরেকটি পথসভা হবে। সেখানেই রাখা হয়েছে দুপুরের খাবারের বিরতি।
কুমিল্লার পর বেলা তিনটার দিকে ফেনীর মহিপালে এবং বিকেল পাঁচটায় মিরসরাই শিল্প এলাকায় পথসভা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর লংমার্চ চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের উদ্দেশে এগিয়ে যাবে। আয়োজকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাত নয়টায় সেখানে সমাপনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, শুরুতে পাঁচ থেকে ছয় হাজার গাড়ি নিয়ে লংমার্চ করার পরিকল্পনা ছিল। তবে দেশের তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবং মানুষের ভোগান্তির কথা বিবেচনায় গাড়ির সংখ্যা এক হাজারে নামিয়ে আনা হয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি সড়কে যাতে অতিরিক্ত ভোগান্তি সৃষ্টি না হয়, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি যানবাহন যাতে আটকে না পড়ে, সে জন্য লংমার্চের গাড়িগুলো সড়কের এক পাশ দিয়ে সারিবদ্ধভাবে চলবে বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং পুলিশের দেওয়া কিছু পরামর্শ কর্মসূচিতে যুক্ত করা হয়েছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম কর্মসূচির পর আরও তিনটি লংমার্চ করার পরিকল্পনা রয়েছে ১১–দলীয় ঐক্যের। এর মধ্যে রংপুর, সিলেট ও খুলনায় কর্মসূচি হবে। সিলেটের লংমার্চে ট্রেন ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। সব লংমার্চ শেষে ঢাকায় মহাসমাবেশ করার কথাও জানিয়েছেন এনসিপি নেতারা।
এদিকে এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম পুরো লংমার্চের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ও প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, ক্ষমতাসীন দলের কেউ যেন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি করে তার দায় বিরোধীদের ওপর চাপাতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে হবে।
লংমার্চে বাধা দেওয়া হলে জনগণই পরিস্থিতি অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবে বলেও মন্তব্য করেন সারজিস আলম। তিনি জানান, শাপলা চত্বর থেকে লালদীঘি পর্যন্ত পুরো রুটে এনসিপির সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলা ইউনিটের নেতা-কর্মীরা সড়কের দুই পাশে অবস্থান করবেন।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার ও মনিরা শারমিন এবং জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলামসহ দলটির নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

