ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—ডাকসুর বর্তমান নেতৃত্বের একাধিক কার্যক্রম নিয়ে ক্যাম্পাসে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শিক্ষককে ঘিরে অপ্রীতিকর ঘটনা, শিক্ষকদের মূল্যায়নে আলাদা ওয়েবসাইট চালু এবং ডাকসু সংগ্রহশালায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি যুক্ত করার মতো বিষয় নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন প্রশ্ন তুলেছে। তবে এসব ঘটনা নিয়ে ডাকসু নেতাদের নিজস্ব ব্যাখ্যাও রয়েছে।
সাম্প্রতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ডাকসু সংগ্রহশালা। সংস্কারের পর সেখানে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি যুক্ত করা হয়। একই সময়ে শেখ মুজিবুর রহমানের আগে থাকা একক ছবিগুলো আর রাখা হয়নি। তবে সংগ্রহশালায় তাঁর ছেলেদের বিয়ের ছবি, বিভিন্ন সংবাদপত্রের কাটিং এবং একটি খোদাইচিত্রে তাঁর উপস্থিতি রয়েছে।
জিন্নাহর ছবি যুক্ত করার পক্ষে সংগ্রহশালা সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত ডাকসু নেতাদের বক্তব্য, তাঁকে গৌরবান্বিত করার উদ্দেশ্যে ছবিগুলো রাখা হয়নি। বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলো তুলে ধরতেই এগুলো যুক্ত করা হয়েছিল। একটি ছবির সঙ্গে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে জিন্নাহর দেওয়া বক্তব্যের তথ্যও রাখা হয়েছিল।
তবে এই ব্যাখ্যা মেনে নেয়নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংগ্রহশালায় জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘ নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নেটওয়ার্কও এ ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, সংগ্রহশালার ঐতিহাসিক নথি ও ছবির বিন্যাস পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যথাযথ নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি। সংগঠনটি নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি এবং সরিয়ে ফেলা ঐতিহাসিক স্মারক পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে। এগুলো শিক্ষক নেটওয়ার্কের অভিযোগ ও দাবি; তদন্তের ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।
জিন্নাহর ছবি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এক শিক্ষার্থী সংগ্রহশালায় থাকা জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে ফেলেন। পরে একদল শিক্ষার্থী ডাকসু ভবনের প্রবেশপথ ও সংগ্রহশালার মেঝেতে জিন্নাহ ও গোলাম আযমের ছবি রেখে পদদলিত করেন। এর আগে ছাত্র ফেডারেশনের নেতা-কর্মীরা জিন্নাহর ছবি রাখার প্রতিবাদে গোলাম আযমকে জুতাপেটার একটি পুরোনো ছবি সংগ্রহশালায় টাঙিয়েছিলেন।
বর্তমান ডাকসুকে ঘিরে বিতর্ক শুধু সংগ্রহশালাতেই সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য ডাকসুর উদ্যোগে একটি ওয়েবসাইট চালুর বিষয়টিও সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশাসনের একটি অংশ প্রশ্ন তুলেছে, শিক্ষক মূল্যায়নের মতো একাডেমিক প্রক্রিয়া ছাত্র সংসদের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে কি না। তাদের বক্তব্য, শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে শিক্ষক মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে পারে, তবে সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত নীতিমালা, প্রাতিষ্ঠানিক তত্ত্বাবধান এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর গোপনীয়তা নিশ্চিত করে হওয়া উচিত।
এ ছাড়া সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দীনকে ঘিরে ডাকসু নেতাদের আচরণ নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। ঘটনাটিকে কেউ কেউ শিক্ষক হেনস্তা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে ওই শিক্ষককে ঘিরে অতীতের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। ফলে বিষয়টি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্য কীভাবে মোকাবিলা করা উচিত—সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।
ডাকসুর ইতিহাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের ছাত্রনেতারা নির্বাচিত হয়েছেন। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী আন্দোলন এবং নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক পর্বে ডাকসু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ঐতিহাসিক নজির রয়েছে। সেই ইতিহাসের কারণেই বর্তমান ডাকসুর কার্যক্রম নিয়ে বিতর্কও বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশেষ করে সংগ্রহশালার সাম্প্রতিক পরিবর্তন এখন আর শুধু ডাকসুর অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে থাকছে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছে, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন প্রতিবাদ করেছে এবং শিক্ষক নেটওয়ার্ক তদন্ত ও জবাবদিহি চেয়েছে। একই সঙ্গে ডাকসুর সংশ্লিষ্ট নেতারা বলছেন, তাঁদের উদ্দেশ্য ইতিহাসের নির্দিষ্ট ঘটনাগুলো তুলে ধরা, কোনো ব্যক্তিকে গৌরবান্বিত করা নয়।
ফলে বর্তমান বিতর্কের মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—ছাত্র সংসদের নিজস্ব উদ্যোগ ও রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গির সীমা কোথায়, আর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারই বা কতটুকু। তদন্ত ও পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সংগ্রহশালা বিতর্কের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কী অবস্থান নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

