চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে বদলে যাচ্ছে নিয়োগদাতাদের চাহিদাও। সিভিতে শুধু ‘কমিউনিকেশন স্কিল’, ‘লিডারশিপ’ কিংবা ‘টিমওয়ার্ক’ লিখে রাখলেই আর অন্য প্রার্থীদের থেকে এগিয়ে থাকা যাচ্ছে না। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, সিভিতে নির্দিষ্ট কারিগরি বা টেকনিক্যাল দক্ষতা উল্লেখ করা প্রার্থীদের চাকরি পাওয়ার হার সফট স্কিল উল্লেখকারীদের তুলনায় ৪২ শতাংশ বেশি।
ক্যারিয়ার ও ওয়ার্কফোর্স সলিউশন প্রতিষ্ঠান কেয়ারমাইন্ডস ৯ হাজার ৭০০টি জীবনবৃত্তান্ত বিশ্লেষণ করে এই তথ্য পেয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, যেসব চাকরিপ্রার্থী তাঁদের সিভিতে কারিগরি দক্ষতা উল্লেখ করেছেন, তাঁদের ২০ শতাংশ পরবর্তী সময়ে নতুন চাকরি পেয়েছেন।
গবেষণায় সবচেয়ে কার্যকর দক্ষতাগুলোর মধ্যে সামনে এসেছে ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন সফটওয়্যার ট্যাবলু। যেসব প্রার্থী সিভিতে ট্যাবলু ব্যবহারে দক্ষতার কথা উল্লেখ করেছেন, তাঁদের ২৫ শতাংশের বেশি নতুন চাকরি পেয়েছেন। অর্থাৎ শুধু সাধারণ দক্ষতার পরিবর্তে চাকরির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কোনো সফটওয়্যার বা প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা প্রার্থীদের বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
ট্যাবলুর পাশাপাশি ডেটা অ্যানালাইসিস, পাইথন ও এসকিউএলের মতো দক্ষতাও গবেষণায় গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তিনির্ভর কাজের পরিধি বাড়ার সঙ্গে এসব দক্ষতার চাহিদাও চাকরির বাজারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে চাকরিপ্রার্থীদের সিভিতে সফট স্কিলের উল্লেখ তুলনামূলক বেশি থাকলেও সেগুলোর সঙ্গে চাকরি পাওয়ার হার কম দেখা গেছে। গবেষণায় বিশ্লেষণ করা সিভির ১৬ দশমিক ৪ শতাংশে যোগাযোগ দক্ষতা বা কমিউনিকেশন স্কিলের কথা উল্লেখ ছিল। কিন্তু এই প্রার্থীদের চাকরি পাওয়ার হার ছিল ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ।
একইভাবে টিমওয়ার্ক, নেতৃত্ব এবং কাস্টমার সার্ভিসের মতো দক্ষতার উল্লেখও নতুন চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম কার্যকর হিসেবে দেখা গেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে এসব দক্ষতার প্রয়োজন নেই। বরং গবেষণাটি ইঙ্গিত করছে, শুধু দক্ষতার নাম উল্লেখ করার চেয়ে সেটি বাস্তবে কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা তুলে ধরা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কেয়ারমাইন্ডসের ক্যারিয়ার বিশেষজ্ঞ ও ক্যারিয়ার কোচ আমান্ডা অগাস্টিনের মতে, যে কেউ নিজেকে ভালো যোগাযোগকারী বা কার্যকর নেতা হিসেবে দাবি করতে পারেন। একইভাবে কোনো প্রযুক্তিতে দক্ষ বলাও সহজ। কিন্তু একজন প্রার্থী সেই দক্ষতা আগের কোনো কাজ, প্রকল্প কিংবা দায়িত্বে কীভাবে ব্যবহার করেছেন, সেটি দেখাতে পারলে তাঁর দাবিটি নিয়োগদাতার কাছে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।
এ কারণে সিভিতে শুধু ‘Leadership’ লেখার পরিবর্তে নেতৃত্ব দিয়ে কোনো দল পরিচালনা করে কী ফল পাওয়া গেছে, সেটি তুলে ধরা যেতে পারে। একইভাবে ‘Data Analysis’ বা ‘Python’ উল্লেখ করলে কোন প্রকল্পে সেই দক্ষতা ব্যবহার করা হয়েছে এবং তার ফল কী ছিল, তা সংক্ষেপে তুলে ধরলে সিভি আরও শক্তিশালী হতে পারে।
গবেষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই–সংক্রান্ত দক্ষতা। বিশ্লেষণ করা সিভিগুলোর মাত্র ৩ শতাংশে এআই টুল ব্যবহারের দক্ষতার উল্লেখ পাওয়া গেছে। কিন্তু যেসব সিভিতে এআই–সংক্রান্ত দক্ষতা ছিল, তাঁদের নতুন চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা অন্যদের তুলনায় ১ দশমিক ৪ গুণ বেশি ছিল।
অগাস্টিনের মতে, এআইয়ের সুবিধা পেতে চাকরিপ্রার্থীকে এআই ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে—এমন নয়। বরং নিজের পেশা বা কাজের ক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত এআই টুলগুলো কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, সেই জ্ঞান অর্জন করাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কর্মক্ষেত্রে এআই টুলের ব্যবহার যত বাড়ছে, ততই বিভিন্ন পেশায় এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতার চাহিদা তৈরি হচ্ছে।
তাই নতুন চাকরির জন্য সিভি তৈরির সময় শুধু প্রচলিত সফট স্কিলের তালিকা দেওয়ার পরিবর্তে নিজের বাস্তব ও প্রাসঙ্গিক কারিগরি দক্ষতাগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি সেই দক্ষতা কোথায় ব্যবহার করা হয়েছে এবং কী ফল পাওয়া গেছে, তার প্রমাণও সিভিতে সংক্ষেপে তুলে ধরলে নিয়োগদাতার কাছে প্রার্থীর সক্ষমতা আরও বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব।

