ইরানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ক্রীড়া স্থাপনায় গত ফেব্রুয়ারিতে চালানো দুটি মার্কিন সামরিক হামলাকে যুদ্ধাপরাধের শামিল বলে মনে করছে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তথ্য অনুসন্ধানী মিশন। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত নতুন প্রতিবেদনে মিশনটি বলেছে, হামলা দুটির জন্য মার্কিন বাহিনী দায়ী—এমন বিশ্বাসের ‘যুক্তিসংগত ভিত্তি’ পাওয়া গেছে।
জাতিসংঘের ইন্ডিপেনডেন্ট ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন অন ইরানের এই প্রতিবেদন জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে উপস্থাপনের কথা রয়েছে। প্রতিবেদনে ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রমের পাশাপাশি ইরানি কর্তৃপক্ষের কর্মকাণ্ডও পর্যালোচনা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের অন্যতম প্রধান বিষয় ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের শাজারেহ তাইয়েবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলা। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ওই বিদ্যালয়ে মার্কিন বাহিনী হামলা চালিয়েছিল বলে মনে করার যুক্তিসংগত ভিত্তি রয়েছে। ইরানি কর্মকর্তাদের হিসাবে, সেখানে দেড় শতাধিক মানুষ নিহত হন, যাঁদের মধ্যে প্রায় ১২০ জন ছিল স্কুলশিক্ষার্থী।
জাতিসংঘের তদন্তে বিদ্যালয়টিকে বেসামরিক স্থাপনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। মিশনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, হামলাটি ছিল নির্বিচার এবং এতে বেসামরিক মানুষের মৃত্যু ও বেসামরিক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ কারণেই ঘটনাটিকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে যুদ্ধাপরাধের শামিল বলে উল্লেখ করেছে মিশন।
মিনাবের বিদ্যালয়ের পাশাপাশি দক্ষিণ ইরানের লামের্দে একটি ক্রীড়া স্থাপনা ও আশপাশের এলাকায় আরেকটি হামলার ঘটনাও প্রতিবেদনে এসেছে। জাতিসংঘ-সমর্থিত বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, ওই ঘটনায় ২২ বেসামরিক মানুষ নিহত হন। দুটি হামলার ক্ষেত্রেই মার্কিন বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার যুক্তিসংগত ভিত্তি পাওয়া গেছে বলে মিশন জানিয়েছে।
মিনাবের স্কুলে হামলার দায় নিয়ে ঘটনার পর থেকেই বিতর্ক চলছিল। হামলার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের দিকেই দায় ঠেলে দিয়েছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অনুসন্ধানে মার্কিন বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার পক্ষে তথ্য সামনে আসে। ওয়াশিংটন পোস্টের যাচাই করা ভিডিও ও স্যাটেলাইট চিত্রে স্কুলটির পাশের ইরানি নৌঘাঁটার কাছে মার্কিন টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার আলামত পাওয়া যায়।
পরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রাথমিক তদন্তের সঙ্গে পরিচিত সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, হামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি টার্গেটিং ভুলের ফল হতে পারে। বিদ্যালয় ভবনটি একসময় পাশের ইরানি সামরিক স্থাপনার অংশ ছিল। পরে সেটি আলাদা করা হলেও হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে পুরোনো গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহারের বিষয়টি তদন্তে উঠে আসে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
মার্চে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানান, স্কুলে হামলার ঘটনা নিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছে। তবে তখনও তিনি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের দায় স্বীকার করেননি। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের নেতৃত্বে ওই তদন্ত শুরু হয়।
এদিকে জাতিসংঘ মিশনের নতুন প্রতিবেদনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের জেনেভাস্থায়ী মিশন তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। মার্কিন কর্মকর্তারা এর আগে বলে আসছেন, তাঁদের সামরিক অভিযান সশস্ত্র সংঘাতের আইন মেনেই পরিচালিত হয়।
জাতিসংঘের মিশন একই প্রতিবেদনে ইরানি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ এনেছে। দেশটিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে হত্যা, নির্যাতনসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মিশনটির মূল্যায়ন। ইরান অবশ্য এর আগে পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
ফলে প্রতিবেদনটি শুধু মিনাবের স্কুলে প্রাণহানির দায় নিয়েই নয়, ইরান যুদ্ধের সময় বেসামরিক স্থাপনায় হামলা এবং সংঘাতের পক্ষগুলোর আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার প্রশ্নকেও নতুন করে সামনে এনেছে।

