কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে আটক করা হয়েছিল ২৮ কিশোরকে। কিন্তু থানায় নেওয়ার পর তাদের কয়েকজন হট্টগোল করে সেখান থেকে বের হয়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে। থানার বাইরে এসে কয়েকজনকে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতেও দেখা যায়। পরে অভিভাবকেরা তাদের কয়েকজনকে ধরে আবার থানায় নিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন।
ঘটনাটি ঘটেছে কুমিল্লার দাউদকান্দি মডেল থানায়। বুধবার সন্ধ্যার পর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান চালায় পুলিশ। সন্ধ্যার পর অপ্রয়োজনে ঘোরাফেরা এবং বিভিন্ন স্থানে দলবদ্ধভাবে আড্ডা দেওয়ার কারণে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য সন্দেহে মোট ২৮ জনকে আটক করা হয়।
আটকের পর সবাইকে দাউদকান্দি মডেল থানায় নেওয়া হয়। পুলিশ জানিয়েছে, আটক কিশোরদের থানাহাজতের একটি পরিত্যক্ত কক্ষে রাখা হয়েছিল। একই কক্ষে একসঙ্গে ২৮ জন থাকায় সেখানে কিছুটা বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।
ঘটনার পর থানার ভেতরের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে একটি কক্ষের ভেতরে প্লাস্টিকের একটি চেয়ার উল্টে পড়ে থাকতে দেখা যায়। কক্ষটির একটি দরজাও ভাঙা অবস্থায় দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ওই দরজা বা চেয়ার কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা নিয়ে পুলিশ ও স্থানীয়দের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।
স্থানীয় এক বাসিন্দার দাবি, থানার একটি কক্ষে আটক থাকা কয়েকজন কিশোর চেয়ার ও দরজা ভাঙচুর করে সেখান থেকে বের হয়ে যায়। এরপর তাদের একটি অংশ থানার সামনে জড়ো হয়ে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকে।
তবে ভাঙচুরের অভিযোগ অস্বীকার করেছে পুলিশ। দাউদকান্দি মডেল থানার উপপরিদর্শক রেজুয়ানুল হক বলেন, আটক কিশোরদের থানাহাজতের একটি পরিত্যক্ত কক্ষে রাখা হয়েছিল। একসঙ্গে ২৮ জন থাকায় কিছুটা ঝামেলা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু থানার কোনো কক্ষের দরজা কিংবা আসবাব ভাঙচুর করা হয়নি।
অন্যদিকে আটকের খবর ছড়িয়ে পড়লে কিশোরদের অভিভাবক ও স্বজনেরা থানার সামনে জড়ো হতে শুরু করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন অভিভাবক দাবি করেন, আটক কিশোরদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অপরাধে জড়িত থাকার কোনো রেকর্ড নেই। তারা স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের সহপাঠীদের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় আড্ডা দিচ্ছিল।
অভিভাবক ও স্বজনদের উপস্থিতির মধ্যে থানার সামনে একপর্যায়ে হট্টগোল ও উত্তেজনাও তৈরি হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন কিশোর থানা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এ সময় দাউদকান্দি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম হ্যান্ডমাইকে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। উত্তেজিত কিশোরদের পাশাপাশি সেখানে উপস্থিত অভিভাবক ও স্বজনদেরও শান্ত করার চেষ্টা করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, থানা থেকে বের হয়ে যাওয়া কয়েকজন কিশোরকে পরে তাদের অভিভাবকেরাই ধরে আবার থানায় নিয়ে যান। এরপর তাদের পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।
শেষ পর্যন্ত আটক ২৮ কিশোরের কাউকেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। সন্ধ্যার পর অপ্রয়োজনে বিভিন্ন আড্ডাস্থলে বসবে না—এমন মুচলেকা নেওয়ার পর রাতে তাদের অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তবে পুরো ঘটনাটি নিয়ে পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকদের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। স্থানীয়দের একাংশ বলছেন, কয়েকজন কিশোর থানার কক্ষের চেয়ার ও দরজা ভেঙে বেরিয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, একসঙ্গে অনেক কিশোর থাকায় কিছুটা ঝামেলা হলেও কোনো দরজা বা আসবাব ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি।
ঘটনার বিষয়ে দাউদকান্দি মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল কেটে দেন।
এদিকে দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির হোসেন ঘটনাটিকে বড় কোনো ঘটনা হিসেবে দেখছেন না। তাঁর ভাষ্য, থানায় তেমন কিছু ঘটেনি এবং পুরো বিষয়টি মূলত একটি ভুল-বোঝাবুঝি।
ফলে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে ২৮ জনকে আটকের পর থানায় ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে দুই ধরনের বক্তব্য সামনে এসেছে। পুলিশ ভাঙচুরের অভিযোগ অস্বীকার করলেও স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, কয়েকজন কিশোর হট্টগোল করে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত আটক সবাইকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

