গুপ্তচরবৃত্তির গল্প মানেই গোপন অভিযান, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র আর শত্রুপক্ষের সঙ্গে লড়াই—‘আনফ্যামিলিয়ার’ সেই পরিচিত কাঠামোর মধ্যে ঢুকিয়েছে দাম্পত্য ও পরিবারের সংকট। জার্মান ভাষার ছয় পর্বের সিরিজটি চলতি বছরের শুরুতে নেটফ্লিক্সে মুক্তির পর দ্রুত আন্তর্জাতিক দর্শকের নজর কাড়ে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই সিরিজটি দেখা হয়েছে ৩ কোটি ১৬ লাখ বার।
গল্পের কেন্দ্রে সাইমন ও মেরেট শ্যাফার। দুজনই একসময় জার্মানির বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা বিএনডির এজেন্ট ছিলেন। সেই জীবন পেছনে ফেলে এখন বার্লিনে পরিচয় গোপন করে একটি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা করেন তাঁরা। কিশোরী মেয়ে নিনাকে নিয়ে তাঁদের সংসারও বাইরে থেকে বেশ স্বাভাবিক।
কিন্তু এই স্বাভাবিক জীবনের আড়ালে লুকিয়ে আছে এমন কিছু সত্য, যা স্বামী-স্ত্রী দুজনই বছরের পর বছর একে অপরের কাছ থেকে গোপন রেখেছেন।
নিনার ১৬তম জন্মদিনের আয়োজনের মধ্যেই তাঁদের কাছে খবর আসে, একজন আহত ব্যক্তি সাহায্য চাইছেন। সাবেক গুপ্তচর হিসেবে এমন পরিস্থিতি সাইমন ও মেরেটের কাছে পুরোপুরি অচেনা নয়। কিন্তু ওই ব্যক্তির আচরণ শুরু থেকেই তাঁদের সন্দেহের মধ্যে ফেলে দেয়।
ঘটনা যত এগোয়, ততই সামনে আসতে থাকে ১৬ বছর আগের একটি বেলারুশ অভিযানের ইতিহাস। সেই অভিযানই একসময় সাইমন ও মেরেটের জীবন বদলে দিয়েছিল। পুরোনো সেই অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোসেফ কোলিভ আবার বার্লিনে হাজির হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
এক এক করে পুরোনো শত্রু, গুপ্তচর, খুনি এবং অতীতের বিভিন্ন চরিত্র তাঁদের বর্তমান জীবনে ফিরে আসতে থাকে। একই সঙ্গে বিএনডির ভেতরে সম্ভাব্য গুপ্তচর, গোপন তথ্য পাচার ও নজরদারির মতো বিষয়ও গল্পে যুক্ত হয়।
তবে সাইমন ও মেরেটের সবচেয়ে বড় সংকট শুধু বাইরের শত্রু নয়। একসঙ্গে এত বছর কাটানোর পর তাঁরা আবিষ্কার করেন, নিজেদের সম্পর্কের মধ্যেই রয়েছে বহু গোপন সত্য ও অবিশ্বাস। ফলে শত্রুদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করার পাশাপাশি তাঁদের লড়াই করতে হয় সংসারটিকেও টিকিয়ে রাখতে।
এই জায়গাতেই সাধারণ স্পাই থ্রিলার থেকে কিছুটা আলাদা হয়ে ওঠে ‘আনফ্যামিলিয়ার’। আন্তর্জাতিক গুপ্তচরবৃত্তির গল্প এবং একটি পরিবারের ভেতরের সংকট এখানে পাশাপাশি এগিয়েছে। ১৬ বছর আগের একটি সিদ্ধান্ত কীভাবে একটি পরিবারের বর্তমান জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে, ধীরে ধীরে সেটিই সামনে আসে।
গল্পে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তাঁদের মেয়ে নিনাও। মা-বাবার অতীত সম্পর্কে তার অনেক কিছুই অজানা। কিন্তু পুরোনো ঘটনা যখন বর্তমান জীবনে আঘাত করতে শুরু করে, তখন নিনাও বুঝতে পারে, এত দিন যে জীবনকে সে স্বাভাবিক বলে জানত, তার আড়ালে রয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগৎ।
মেরেট চরিত্রে অভিনয় করেছেন সুসানে ভল্ফ। সাইমন চরিত্রে আছেন ফেলিক্স ক্রেমার। মেরেটকে একই সঙ্গে ঠান্ডা মাথার সাবেক গুপ্তচর এবং একজন মা ও স্ত্রী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। পরিস্থিতি জটিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চরিত্রের ভেতরের দ্বন্দ্বও সামনে আসে।
অন্যদিকে ক্রেমারের সাইমন আরও জটিল। স্ত্রী ও মেয়েকে রক্ষার জন্য নেওয়া তাঁর কিছু সিদ্ধান্তই একসময় দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য নতুন সংকট তৈরি করে।
জোসেফ কোলিভ চরিত্রে অভিনয় করেছেন স্যামুয়েল ফিনজি। এ ছাড়া অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন আন্দ্রেয়াস পিটশমান, হেনরি হ্যুবশেন, মায়া বন্স, সেয়নেব সালে, জেনিয়া রিকোভা, নাটালিয়া বেলিৎসকি, অ্যারন আল্টারাস ও লরেন্স রুপ।
সিরিজটির নির্মাতা পল কোটস। চিত্রনাট্যেও নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন কিম জিমারমান ও আলেক্সান্ডার জাইব্ট। প্রধান পরিচালক লেনার্ট রুফ, তাঁর সঙ্গে পরিচালনায় ছিলেন ফিলিপ লাইনেমান। প্রযোজক আন্দ্রেয়াস বারাইস।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি নেটফ্লিক্সে মুক্তি পায় ছয় পর্বের সিরিজটি। প্রতিটি পর্বের দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০ মিনিট। গল্পে বার্লিন শহরের ঠান্ডা ও ধূসর পরিবেশকে রহস্যময় আবহ তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।
মুক্তির পরপরই দর্শকদের কাছ থেকে বড় সাড়া পায় ‘আনফ্যামিলিয়ার’। ২ থেকে ৮ ফেব্রুয়ারির সপ্তাহে ৪৯ লাখ ভিউ নিয়ে নেটফ্লিক্সের অ-ইংরেজি সিরিজের তালিকায় শীর্ষে উঠে আসে এটি। পরের সপ্তাহেই ভিউ বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৪ লাখে।
১৬ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারির সপ্তাহেও ৪৩ লাখ ভিউ নিয়ে অ-ইংরেজি সিরিজের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল সিরিজটি। পরে নেটফ্লিক্সের প্রথম ছয় মাসের হিসাবে এর মোট ভিউ দাঁড়ায় ৩ কোটি ১৬ লাখ। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সিরিজটি ৩৫টি দেশে নেটফ্লিক্সের তালিকার শীর্ষেও উঠেছিল।
দর্শকদের পাশাপাশি সমালোচকদের কাছ থেকেও মোটামুটি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছে ‘আনফ্যামিলিয়ার’। রটেন টমেটোজে প্রথম মৌসুমের টমেটোমিটার স্কোর ৭৮ শতাংশ এবং দর্শক স্কোর ৬৯ শতাংশ। বিশেষ করে সুসানে ভল্ফ ও ফেলিক্স ক্রেমারের অভিনয়, চরিত্র নির্মাণ এবং গল্পে দাম্পত্য সংকট ও গুপ্তচরবৃত্তিকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি প্রশংসা পেয়েছে।
তবে সমালোচনাও রয়েছে। কয়েকটি পর্যালোচনায় গল্পের কিছু অংশকে গতানুগতিক, কিছু মোড়কে অনুমানযোগ্য এবং কোনো কোনো জায়গায় গতি ধীর বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ‘আনফ্যামিলিয়ার’ শুধু সাবেক দুই গুপ্তচরের পুরোনো শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে জমে থাকা গোপন সত্য, অবিশ্বাস এবং পরিবার রক্ষার গল্প। আর গুপ্তচরবৃত্তির উত্তেজনার সঙ্গে সেই ব্যক্তিগত সংকটের মিশেলই সিরিজটিকে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে আলোচিত করে তুলেছে।

