‘ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়’—পরিচিত এই প্রবাদ দিয়ে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন ২০২৬ নিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন একজন গবেষক ও বিশ্লেষক। তাঁর মতে, অতীতে একই ধরনের আইন প্রয়োগের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নতুন সংশোধনীর কয়েকটি প্রস্তাব ভবিষ্যতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সাইবার আইন নিয়ে তাঁর উদ্বেগ নতুন নয়। একই ধরনের আইন নিয়ে প্রায় সাড়ে চার বছর গবেষণার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলছেন, অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই নতুন সংশোধনীর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে এখনই আলোচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ প্রণয়নের পর এরই মধ্যে এক দফা সংশোধন হয়েছে। সরকারি নথিতে ১ জুলাই ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ আইন হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে। এরপর আবার নতুন সংশোধনের খসড়া সামনে এসেছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ওয়েবসাইটেও সেপ্টেম্বরে নতুন সংশোধনী খসড়া প্রকাশের তথ্য রয়েছে।
নতুন প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগের অন্যতম জায়গা হচ্ছে অনলাইনে প্রকাশিত তথ্য নিয়ন্ত্রণের সুযোগ। প্রস্তাবিত নতুন ধারা ২৬(ক)-তে সাইবার স্পেসে ‘গুজব’, ‘অপতথ্য’, ‘ভুল তথ্য’ কিংবা ‘মানহানিমূলক’ তথ্য প্রকাশ বা প্রচারের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, এসব শব্দের সংজ্ঞা ও প্রয়োগ যথেষ্ট স্পষ্ট না হলে বৈধ সমালোচনা, সাংবাদিকতা কিংবা সাধারণ নাগরিকের মতপ্রকাশও আইনি ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে প্রতিষ্ঠানকেও আইনের আওতায় আনার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কোনো প্রতিষ্ঠান দোষী সাব্যস্ত হলে তার নিবন্ধন, লাইসেন্স বা কার্যক্রম স্থগিত কিংবা বাতিল করার সুযোগ রাখার প্রস্তাব রয়েছে। সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, এ ধরনের বিধান সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
কনটেন্ট অপসারণ এবং ডিজিটাল ডিভাইস ও তথ্য তল্লাশি বা জব্দের ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, কোন কর্তৃপক্ষ কী পরিস্থিতিতে এসব ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারবে, তা যথেষ্ট সুনির্দিষ্ট না হলে আইনটির অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে খসড়ার কিছু বিধানে কনটেন্ট অপসারণের পর বিচারিক অনুমোদনের ব্যবস্থাও প্রস্তাব করা হয়েছে।
সংশোধনী নিয়ে উদ্বেগ শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনও বলেছে, সাইবার অপরাধ মোকাবিলা, নাগরিকের গোপনীয়তা রক্ষা এবং অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের আইন যেন মতপ্রকাশ, তথ্যপ্রাপ্তি ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর অযৌক্তিক বিধিনিষেধ তৈরি না করে, সে বিষয়ে তারা সতর্ক করেছে।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত সংশোধনী এখনো চূড়ান্ত নয়। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান ২৬ সেপ্টেম্বর এক আলোচনায় বলেন, মানুষের সুরক্ষার পাশাপাশি অনলাইনে অপতথ্য মোকাবিলার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত আইন নিয়ে আলোচনা, পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের সুযোগ এখনো আছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
ফলে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে দুটি বিষয়—সাইবার অপরাধ ও অপতথ্য থেকে নাগরিককে সুরক্ষা দেওয়া এবং একই সঙ্গে মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। সংশোধনীটি শেষ পর্যন্ত কীভাবে চূড়ান্ত হয় এবং অস্পষ্ট বা ব্যাপকভাবে প্রয়োগযোগ্য বিধানগুলোতে কী ধরনের সুরক্ষা রাখা হয়, তার ওপরই আইনটির বাস্তব প্রভাব অনেকাংশে নির্ভর করবে।

