শিরোনাম: পিএসসির সুপারিশের পরও নিয়োগে বাদ ৫৭ জন, আবারও প্রশ্নের মুখে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া
৪৯তম বিশেষ বিসিএসে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগের জন্য ৬৬৮ জনকে সাময়িকভাবে মনোনয়ন দিয়েছিল বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনে নিয়োগ পেয়েছেন ৬১১ জন। অর্থাৎ পিএসসির সুপারিশ পাওয়া ৫৭ জন প্রথম দফার প্রজ্ঞাপনে জায়গা পাননি। ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে তাঁদের বাদ পড়ার সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
এই ঘটনা সরকারি চাকরিতে নিয়োগের আগে যাচাই-বাছাই এবং পুলিশ ভেরিফিকেশনের ভূমিকা নিয়ে পুরোনো বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার একাধিক ধাপ পেরিয়ে পিএসসির সুপারিশ পাওয়ার পরও একজন প্রার্থী কেন চূড়ান্ত নিয়োগ থেকে বাদ পড়বেন এবং সেই সিদ্ধান্তের কারণ সংশ্লিষ্ট প্রার্থী জানতে পারবেন কি না—এ প্রশ্ন নতুন নয়।
৪৯তম বিশেষ বিসিএসে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের বিভিন্ন বিষয়ে মোট ৬৮৩টি শূন্য পদ ছিল। এসব পদের বিপরীতে পিএসসি ৬৬৮ জনকে নিয়োগের জন্য সাময়িকভাবে মনোনয়ন দিয়েছিল। যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায় বাকি ১৫টি পদে কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। কিন্তু চূড়ান্ত নিয়োগ প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর দেখা যায়, সেই ৬৬৮ জনের মধ্যেও ৫৭ জনের নাম নেই।
পিএসসি অবশ্য জানিয়েছে, তাদের দায়িত্ব প্রার্থী সুপারিশ করা। চূড়ান্ত নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে কাকে নিয়োগ দেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয়ই নেয়। তবে প্রথম দফার প্রজ্ঞাপনে ৫৭ জনের নাম না থাকার কারণ প্রকাশ না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
এ ধরনের বিতর্ক বাংলাদেশে নতুন নয়। বিগত সরকারের সময়েও বিসিএসে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ ও পিএসসির সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের মধ্যে কারও কারও নিয়োগ পুলিশ ভেরিফিকেশনসহ বিভিন্ন যাচাই-বাছাইয়ের কারণে আটকে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
সে সময় এ ধরনের ব্যবস্থার সমালোচনা করেছিলেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার। নেতিবাচক পুলিশ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর নিয়োগ আটকে দেওয়ার প্রসঙ্গে তাঁর অবস্থান ছিল—কোনো প্রার্থী ফৌজদারি অপরাধে জড়িত না হলে শুধু অন্য কারণে তাঁর নিয়োগ আটকে দেওয়া উচিত নয়। তিনি এমন চর্চাকে অন্যায় ও অনৈতিক বলেও সমালোচনা করেছিলেন।
মূল প্রশ্নটি তাই একজন প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় বা পারিবারিক পটভূমি নয়; বরং নিয়োগে কোন বিষয়গুলো বিবেচিত হবে এবং বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কতটা স্বচ্ছ হবে। পিএসসির প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সুপারিশ পাওয়ার পর কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে আইনগত বা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য বাধা থাকলে সেটি নির্ধারণের সুস্পষ্ট প্রক্রিয়া থাকা প্রয়োজন। একইভাবে নিয়োগ না পাওয়ার কারণ জানার সুযোগ থাকা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে।
৪৯তম বিশেষ বিসিএসের ঘটনায় প্রথম দফায় সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। কারণ বাদ পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মেধাক্রমে শীর্ষে থাকা প্রার্থীও রয়েছেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে শুধু মেধাক্রমে এগিয়ে থাকা চূড়ান্ত নিয়োগের নিশ্চয়তা দেয় কি না, সেটিও নির্ভর করে প্রচলিত নিয়োগবিধি ও পরবর্তী যাচাই-বাছাইয়ের ওপর।
সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের যেমন প্রার্থীর প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করার দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি সেই যাচাইয়ের মানদণ্ড স্পষ্ট ও সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিচয় বা পরিবারের কারও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার মতো বিষয় যদি কোনো সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখে, তাহলে নিয়োগপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে।
৪৯তম বিশেষ বিসিএসে প্রথম দফার প্রজ্ঞাপন থেকে ৫৭ জনের নাম বাদ পড়ার ঘটনা তাই কেবল কয়েকজন চাকরিপ্রার্থীর নিয়োগের বিষয় নয়। এটি সরকারি চাকরিতে পিএসসির সুপারিশের পরবর্তী যাচাই-বাছাই কতটা স্বচ্ছ, কোন পরিস্থিতিতে একজন সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীকে নিয়োগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় এবং সেই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা কতটা প্রকাশ করা উচিত—সেই পুরোনো প্রশ্নগুলোও আবার সামনে এনেছে।

