ঢাকার ফুটপাত ও সড়ক দখল করে হকারদের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসা নগরজীবনে দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা। পথচারীদের হাঁটার জায়গা সংকুচিত হওয়া থেকে শুরু করে যান চলাচলে বাধা—এর প্রভাব প্রতিদিনই ভোগ করতে হচ্ছে নগরবাসীকে। বিশেষ করে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ও আশপাশের সড়কে সমস্যাটি দীর্ঘদিন ধরেই প্রকট। ফলে এলাকাটি অবৈধ দখলমুক্ত করা এবং ফুটপাত পথচারীদের জন্য ফিরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দ্বিমত থাকার সুযোগ কম।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, হকার উচ্ছেদের পদ্ধতি কী হবে এবং উচ্ছেদের পর পরিস্থিতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে?
বুধবার মিরপুর-১০ এলাকায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ফুটপাতের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুর এবং ডিএনসিসির তিনটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ঘটনার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি সংঘর্ষের একটি কারণ হয়ে থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন।
মিরপুরের ঘটনা আবারও পুরোনো একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—শুধু অভিযান চালিয়ে হকার সমস্যার স্থায়ী সমাধান কতটা সম্ভব?
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে, ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান চালানো হয়, অস্থায়ী দোকান সরিয়ে দেওয়া হয় এবং মালামাল জব্দ করা হয়। কিন্তু কিছুদিন পর অনেক জায়গায় আবারও হকারদের ফিরে আসতে দেখা যায়। মিরপুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করেও একই ধরনের উচ্ছেদ ও পুনর্দখলের চক্র নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তাই হকার সমস্যাকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে সমাধান অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে। ফুটপাত অবশ্যই পথচারীর জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে এবং সড়ক যানবাহন চলাচলের উপযোগী রাখতে হবে। একই সঙ্গে হকারদের জীবিকা এবং তাঁদের কোথায়, কখন ও কী শর্তে ব্যবসার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে—সেটিও নগর ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে মিরপুর-১০-এর মতো ব্যস্ত এলাকায় কোন অংশ পুরোপুরি হকারমুক্ত থাকবে, কোথায় নির্ধারিত স্থানে ব্যবসার সুযোগ থাকতে পারে, ব্যবসার সময়সীমা কী হবে এবং নিয়ম ভাঙলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয়ে আগেই সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।
এর সঙ্গে জরুরি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সিটি করপোরেশন এবং স্থানীয় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়। কারণ বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া পরিচালিত হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। বুধবারের ঘটনা সেই ঝুঁকিকেই সামনে এনেছে।
সংঘর্ষের ঘটনায় পরবর্তী সময়ে মিরপুর ও কাফরুল থানায় চারটি মামলা হয়েছে এবং পুলিশ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। মামলাগুলোতে পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা, গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সরকারি সম্পত্তির ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে মামলা ও গ্রেপ্তার এক বিষয়, আর রাজধানীর ফুটপাত ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আরেক বিষয়। অভিযান শেষে যদি কয়েক দিন পর আবার একই জায়গায় দোকান বসে, তাহলে উচ্ছেদের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়।
ঢাকার ফুটপাতকে পথচারীদের জন্য ফিরিয়ে দেওয়া জরুরি। একইভাবে হকার ব্যবস্থাপনাকেও একটি স্থায়ী কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। নির্ধারিত স্থান, সময়, নিবন্ধন, নিয়মিত নজরদারি এবং আইন প্রয়োগ—সবকিছুর সমন্বয়ে পরিকল্পনা না করলে এক দিনের উচ্ছেদ অভিযান হয়তো ফুটপাত সাময়িকভাবে পরিষ্কার করবে, কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান করবে না।
মিরপুরের ঘটনা তাই শুধু একটি উচ্ছেদ অভিযানকে ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনা নয়; এটি রাজধানীর হকার ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের দুর্বলতাকেও নতুন করে সামনে এনেছে। এখন প্রয়োজন এমন ব্যবস্থা, যাতে একদিকে পথচারী ও যান চলাচলের অধিকার নিশ্চিত হয়, অন্যদিকে একই উচ্ছেদ ও পুনর্দখলের চক্র বারবার ফিরে না আসে।

