বলিউডে পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে দাপটের সঙ্গে কাজ করছেন অমিতাভ বচ্চন। কখনো ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’, কখনো পরিণত বয়সের শক্তিশালী চরিত্র, আবার কখনো ছোট পর্দার সঞ্চালক—নিজেকে বারবার নতুনভাবে তুলে ধরেছেন তিনি। তবে তাঁর দীর্ঘ পথচলা শুধু সাফল্যের নয়। ভয়াবহ দুর্ঘটনা, শারীরিক জটিলতা, রাজনৈতিক বিতর্ক, ব্যবসায় বিপুল লোকসান এবং ঋণের বোঝা—সবকিছুর মধ্য দিয়েই যেতে হয়েছে তাঁকে। আজ ১১ অক্টোবর তাঁর ৮৪তম জন্মদিন।
১৯৪২ সালের ১১ অক্টোবর উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদে, বর্তমানে যার নাম প্রয়াগরাজ, জন্মগ্রহণ করেন অমিতাভ। তাঁর বাবা ছিলেন কবি হরিবংশ রাই বচ্চন, মা তেজি বচ্চন। প্রথমে তাঁর নাম ‘ইনকিলাব’ রাখার কথা ভেবেছিলেন বাবা। পরে কবি সুমিত্রানন্দন পন্তের পরামর্শে তাঁর নাম রাখা হয় অমিতাভ।
১৯৬৯ সালে ‘সাত হিন্দুস্তানি’ দিয়ে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু হলেও প্রথম দিকে তাঁর পথ সহজ ছিল না। দীর্ঘদেহী গড়ন ও ভারী কণ্ঠস্বর নিয়ে সংশয় ছিল চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টদের। অথচ পরবর্তী সময়ে সেই কণ্ঠস্বর ও ব্যক্তিত্বই হয়ে ওঠে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়গুলোর একটি।
১৯৭৩ সালের ‘জঞ্জির’ বদলে দেয় অমিতাভের ক্যারিয়ার। এরপর ‘দিওয়ার’, ‘শোলে’, ‘ডন’, ‘ত্রিশূল’ ও ‘কালা পাথর’-এর মতো সিনেমায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ক্ষুব্ধ তরুণের চরিত্র তাঁকে এনে দেয় ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ পরিচিতি। তাঁর বহু সিনেমায় চরিত্রের নামও ছিল ‘বিজয়’।
ক্যারিয়ারের সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্তটি আসে ১৯৮২ সালে। ২৬ জুলাই বেঙ্গালুরুতে ‘কুলি’ সিনেমার শুটিংয়ে পুনীত ইসারের সঙ্গে মারপিটের একটি দৃশ্য ধারণের সময় গুরুতর আহত হন অমিতাভ। একটি টেবিলের ওপর পড়ার দৃশ্য করতে গিয়ে পেটে আঘাত পান তিনি। ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাঁর অন্ত্র।
অবস্থা এতটাই সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে যে একাধিক অস্ত্রোপচার করতে হয়। দীর্ঘদিন হাসপাতালে চলে চিকিৎসা। ভারতজুড়ে ভক্তরা তাঁর সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করেন। বাস্তব জীবনের সেই দুর্ঘটনার প্রভাব পড়ে সিনেমার গল্পেও। মূল পরিকল্পনায় ‘কুলি’র শেষ দিকে তাঁর চরিত্রের মৃত্যু হওয়ার কথা থাকলেও পরে সেই সমাপ্তি পরিবর্তন করা হয়।
দুর্ঘটনার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও তাঁকে বহন করতে হয়েছে। অমিতাভ পরবর্তী সময়ে জানিয়েছিলেন, চিকিৎসার সময় রক্তসঞ্চালনের মাধ্যমে তাঁর শরীরে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস প্রবেশ করেছিল। ২০০০ সালে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষায় বিষয়টি ধরা পড়ে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তখন তাঁর যকৃতের প্রায় ৭৫ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
অমিতাভের জীবনের আরেক আলোচিত অধ্যায় রাজনীতি। রাজীব গান্ধীর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ছিল। ১৯৮৪ সালে কংগ্রেসের প্রার্থী হয়ে এলাহাবাদ আসন থেকে নির্বাচনে জয়ী হন তিনি। তবে রাজনীতিতে বেশিদিন থাকেননি। ১৯৮৭ সালে সংসদ সদস্যের পদ ছেড়ে দেন।
এরপর বফর্স কামান কেনাকাটার দুর্নীতি বিতর্কে তাঁর ও পরিবারের নাম উঠে আসে। বিষয়টি তাঁর ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেললেও তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছিল—এমন তথ্য নেই। বফর্স অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত সাবেক সুইডিশ পুলিশ কর্মকর্তা স্টেন লিন্ডস্ট্রম পরবর্তী সময়ে অমিতাভের নাম জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। সিবিআইয়ের এক কর্মকর্তাও জানিয়েছিলেন, নিয়মিত মামলা বা পরবর্তী অভিযোগপত্রে অমিতাভকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।
রাজনীতি থেকে ফিরে অভিনয়ে মনোযোগ দিলেও নব্বইয়ের দশকে সামনে আসে আরেক বড় সংকট। অমিতাভ বচ্চন করপোরেশন লিমিটেড বা এবিসিএলের মাধ্যমে চলচ্চিত্র প্রযোজনা, অনুষ্ঠান আয়োজনসহ বিনোদনশিল্পের বিভিন্ন খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণের চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই উদ্যোগ সফল হয়নি।
একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটির সঞ্চিত লোকসান ৭০ কোটি রুপির বেশি হয়ে যায়। ঋণদাতা, মামলা এবং আর্থিক চাপের মধ্যে পড়ে অমিতাভের ব্যক্তিগত জীবনও বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে। তিনি নিজেই পরে জানিয়েছিলেন, পাওনাদারেরা বাড়িতে এসে টাকা চাইতেন এবং কখনো অপমানজনক আচরণও করতেন।
কঠিন সেই সময়েই আবার অভিনয়ে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন অমিতাভ। কাজের জন্য যশ চোপড়ার কাছে যান। এরপর আদিত্য চোপড়ার ‘মোহাব্বতে’ সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পান। ২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি তাঁর ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
একই বছর তাঁর সামনে আসে আরেকটি সুযোগ—টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’। বড় পর্দার সুপারস্টার ছোট পর্দায় কাজ করলে তাঁর তারকাখ্যাতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—তখন এমন আশঙ্কাও ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই অনুষ্ঠানই তাঁর প্রত্যাবর্তনের অন্যতম বড় মাধ্যম হয়ে ওঠে।
ব্যর্থ ব্যবসা, ঋণের বোঝা ও কাজের সংকট কাটিয়ে নতুনভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছে যান অমিতাভ। যে ভারী কণ্ঠস্বর একসময় তাঁর ক্যারিয়ারের পথে বাধা হিসেবে দেখা হয়েছিল, সেই কণ্ঠই ছোট পর্দায় তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৬৯ সালে শুরু হওয়া সেই পথচলায় কখনো মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন, কখনো অর্থনৈতিকভাবে প্রায় নিঃস্ব হওয়ার পরিস্থিতিতে পড়েছেন, আবার রাজনৈতিক বিতর্কেও জড়িয়েছে তাঁর নাম। কিন্তু প্রতিবারই নতুন কোনো পথে ফিরে এসেছেন অমিতাভ বচ্চন। ৮৪তম জন্মদিনে তাঁর দীর্ঘ জীবনের গল্প তাই শুধু একজন সুপারস্টারের সাফল্যের ইতিহাস নয়, বারবার প্রতিকূলতা পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পও।

