গর্ভাবস্থায় মা ও গর্ভের শিশুর অবস্থা পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা আল্ট্রাসনোগ্রাফি। এর মাধ্যমে গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি, অবস্থান ও বিভিন্ন অঙ্গের গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। একই সঙ্গে প্রসবের আগে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন তথ্য জানতে চিকিৎসকদের সহায়তা করে এই পরীক্ষা।
সাধারণত গর্ভাবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে তিনবার আল্ট্রাসনোগ্রাফি করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে মায়ের শারীরিক অবস্থা, বয়স কিংবা গর্ভাবস্থায় কোনো জটিলতা থাকলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত স্ক্যানের পরামর্শ দিতে পারেন।
প্রথম আল্ট্রাসনোগ্রাফি কখন
প্রথম গর্ভকালীন চেকআপের সময়, সাধারণত গর্ভাবস্থার ৬ থেকে ৮ সপ্তাহের মধ্যে প্রথম আল্ট্রাসনোগ্রাফি করা হয়। এই পরীক্ষায় গর্ভকাল কত সপ্তাহ হয়েছে এবং সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
এ ছাড়া গর্ভে একটি নাকি যমজ বা একাধিক শিশু রয়েছে এবং ভ্রূণ জরায়ুর মধ্যে সঠিক জায়গায় অবস্থান করছে কি না, সেটিও এই পর্যায়ের স্ক্যানে দেখা হয়।
১৮ থেকে ২২ সপ্তাহে অ্যানোমালি স্ক্যান
গর্ভাবস্থার ১৮ থেকে ২২ সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয় আল্ট্রাসনোগ্রাফি করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এটি সাধারণভাবে ‘অ্যানোমালি স্ক্যান’ নামে পরিচিত।
এই পর্যায়ের স্ক্যানে শিশুর বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। মুখমণ্ডল, হাত-পা, পেট ও নাড়িভুঁড়ি, হাড়, হৃদ্যন্ত্র, কিডনি, মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের গঠন খুঁটিয়ে দেখা হয়।
এর মাধ্যমে শিশুর কোনো জন্মগত ত্রুটি বা অ্যানোমালি আছে কি না, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঠিকভাবে গড়ে উঠছে কি না এবং শিশুর বৃদ্ধি স্বাভাবিক গতিতে হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। পাশাপাশি শিশুর আকার ও আনুমানিক ওজন সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়।
শেষ দিকে তৃতীয় আল্ট্রাসনোগ্রাফি
গর্ভাবস্থার ৩৬ থেকে ৩৮ সপ্তাহের মধ্যে তৃতীয় আল্ট্রাসনোগ্রাফি করার পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসায় এই পর্যায়ের স্ক্যান থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।
এ সময় গর্ভফুল বা প্লাসেন্টার অবস্থান দেখা হয়। পাশাপাশি গর্ভের শিশু লম্বালম্বি, আড়াআড়ি নাকি কোণাকুণি অবস্থানে রয়েছে, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা হয়।
শিশুর চারপাশে থাকা অ্যামনিওটিক ফ্লুইড বা তরলের পরিমাণ এবং গর্ভের ভেতরে শিশুর নড়াচড়াও এই স্ক্যানে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
কখন প্রয়োজন হতে পারে এনটি স্ক্যান
তিনটি নিয়মিত স্ক্যানের পাশাপাশি বেশি বয়সে গর্ভধারণ করা মায়েদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক ১০ থেকে ১৪ সপ্তাহের মধ্যে আরেকটি স্ক্যানের পরামর্শ দিতে পারেন।
এটি ‘নিউকাল ট্রান্সলুসেন্সি স্ক্যান’ বা এনটি স্ক্যান নামে পরিচিত। এতে অন্যান্য তথ্যের পাশাপাশি শিশুর ঘাড়ের কাছে থাকা তরলের পরিমাণ পরিমাপ করা হয়।
বারবার আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে কি শিশুর ক্ষতি হয়
গর্ভাবস্থায় আল্ট্রাসনোগ্রাফি করা নিয়ে অনেক মা উদ্বিগ্ন থাকেন। তবে আল্ট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষায় গর্ভবতী মা বা গর্ভের শিশুর ক্ষতি হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গর্ভাবস্থায় প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে এই পরীক্ষা করানো নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়।
তবে কোন সময়ে কতবার আল্ট্রাসনোগ্রাফি প্রয়োজন, সেটি সবার ক্ষেত্রে এক নয়। তাই নিজের সিদ্ধান্তে পরীক্ষা করানোর পরিবর্তে গর্ভাবস্থার অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করাই ভালো।
তথ্য দিয়েছেন ডা. সাবরিনা সুলতানা মিষ্টি, সহকারী অধ্যাপক (গাইনি অ্যান্ড অবস), স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল। তিনি গাইনি, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন।

