মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩, ২৭ সফর ১৪৪৮

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বড় আশঙ্কাগুলোর একটি হলো—এই প্রযুক্তির বিস্তারে বিপুলসংখ্যক মানুষের চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে কি না। তবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই কিছু চাকরি কমিয়ে দিতে পারে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে নতুন কাজের সুযোগও তৈরি করতে পারে।

অর্থাৎ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এআই শুধু চাকরি হারানোর আশঙ্কা নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর একটি বড় সুযোগও হতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের ‘ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬: দ্য প্রমিজ অব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ প্রতিবেদনে এআইয়ের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর বিদ্যমান চাকরির প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ জেনারেটিভ এআইয়ের কারণে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে উচ্চ আয়ের দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই হার অনেক বেশি—প্রায় ১৪ দশমিক ২ শতাংশ।

অন্যদিকে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর প্রায় ১৬ দশমিক ২ শতাংশ চাকরিতে এআই মানুষের কাজকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন না করে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

এর অন্যতম কারণ হলো, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এআই দিয়ে সহজে স্বয়ংক্রিয় করা যায়—এমন চিন্তাশক্তিনির্ভর কাজের অংশ তুলনামূলকভাবে কম। তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগ, অর্থ এবং ব্যবসায়িক সেবার মতো খাতে এআইয়ের প্রভাব বেশি পড়তে পারে। কিন্তু এসব খাতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কর্মসংস্থানের অংশ এখনো তুলনামূলকভাবে কম।

ফলে বাংলাদেশের মতো দেশে এআইয়ের কারণে খুব দ্রুত বিপুলসংখ্যক মানুষের চাকরি চলে যাবে—এমন আশঙ্কা আপাতত তুলনামূলক কম। বরং মানুষের কাজের ধরন পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

তবে এর অর্থ এই নয় যে সবাই নিরাপদ। বিশ্বব্যাংকের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় বিশেষ করে তরুণ ও মাঝারি দক্ষতার কর্মীরা এআইয়ের পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

চ্যাটজিপিটি জনপ্রিয় হওয়ার পর যেসব কাজ তুলনামূলক সহজে এআই দিয়ে করা সম্ভব, সেসব কাজের চাহিদা কিছু ক্ষেত্রে কমেছে। চীন ও ভারতেও জেনারেটিভ এআই চালুর পর কিছু ধরনের চাকরির বিজ্ঞপ্তি কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। বিশেষ করে উচ্চ দক্ষতার সেবা খাতে এর প্রভাব পড়ছে এবং তরুণ কর্মীরা তুলনামূলকভাবে বেশি প্রভাবিত হচ্ছেন।

তবে এআইয়ের আরেকটি বড় সুবিধা হতে পারে ছোট ব্যবসার জন্য।

নিম্ন ও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বিপুলসংখ্যক মানুষ ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। অনেক প্রতিষ্ঠানের কর্মীসংখ্যা ১০ জনেরও কম। আবার অর্ধেকের বেশি মানুষ নিজেরাই নিজেদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন।

কৃষি, খুচরা ব্যবসা, আবাসন ও খাদ্যসেবার মতো খাতে এসব ছোট ব্যবসার বড় অংশ রয়েছে।

বিশ্বব্যাংক বলছে, এসব ব্যবসার জন্য এআই নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। মেসেজিং অ্যাপ, ব্যবসায়িক সফটওয়্যার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে এআই যুক্ত হওয়ায় বড় ধরনের প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ ছাড়াই ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো কিছু সুবিধা নিতে পারে।

ভারত, জর্ডান, কেনিয়া, মেক্সিকো, নাইজেরিয়া ও থাইল্যান্ডের অনেক ছোট প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ব্যবসায়িক কাজে এআই চ্যাটবট ব্যবহার শুরু করেছে। এমনকি উন্নত ইন্টারনেট অবকাঠামো না থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে এআই ব্যবহার করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

তবে এর জন্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এআই ব্যবহারের কিছু ইতিবাচক উদাহরণ তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক। বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআইনির্ভর মেডিকেল ইমেজিং ব্যবহারের ফলে ডায়াবেটিসজনিত চোখের জটিলতা শনাক্তের পরীক্ষা প্রতিদিন প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।

বাংলাদেশে সরকারি ডিজিটাল সেবার যে অবকাঠামো ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে, সেটিকেই ভবিষ্যতে এআই ব্যবহারের ভিত্তি হিসেবে কাজে লাগানো সম্ভব বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। কৃষি, স্বাস্থ্য এবং নাগরিকসেবার মতো খাতেও এআই ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

তবে সব ক্ষেত্রে সাফল্য আসেনি। মোবাইল ফোনের তথ্য ব্যবহার করে দরিদ্র পরিবার শনাক্তের একটি এআইভিত্তিক পদ্ধতি প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। প্রচলিত ব্যবস্থার তুলনায় ওই পদ্ধতিতে তথ্যের নির্ভুলতাও কম ছিল।

এ কারণে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ হলো, অন্য দেশের প্রযুক্তি সরাসরি গ্রহণ না করে বাংলাদেশের স্থানীয় বাস্তবতায় সেগুলো যাচাই করতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করে নিতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রযুক্তি গ্রহণের খরচ ও অবকাঠামো। এআইয়ের সুফল পেতে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, দ্রুতগতির ইন্টারনেট, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং দক্ষ জনবল প্রয়োজন।

কানাডীয় অর্থনীতিবিদ জ্যঁ-লুই আরকাঁও একই ধরনের মত দিয়েছেন। ঢাকায় সানেম আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, যেসব অর্থনীতিতে দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে, তারা এআই থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি লাভবান হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। কারণ এআই কিছু ক্ষেত্রে দক্ষতার ঘাটতি পূরণে সহায়তা করতে পারে।

তবে সেই সুবিধা পেতে প্রযুক্তি ব্যবহারের খরচ যেন উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে খুব বেশি বৈষম্য তৈরি না করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে এআই ও অটোমেশনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে সতর্কতাও রয়েছে।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডির এক নীতিপত্রে বলা হয়েছে, অটোমেশন ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের উৎপাদন খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে পড়তে পারে।

সিপিডির হিসাবে, অটোমেশনের কারণে তৈরি পোশাক খাতের সর্বোচ্চ ১২ লাখ ২০ হাজার চাকরি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ২০৪১ সালের মধ্যে নারী পোশাকশ্রমিকদের প্রায় ৬০ শতাংশের কর্মসংস্থান বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কার কথাও নীতিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এআইয়ের পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশের জন্য যুক্ত হচ্ছে এলডিসি উত্তরণ, বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ডিজিটাল অর্থনীতির দ্রুত বিস্তার।

২০২৪ সালে বাংলাদেশে প্রায় ১৩ লাখ কর্মসংস্থান কমেছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশই নারী কর্মী। একই সময়ে উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান প্রায় ৮১ লাখে স্থির রয়েছে। সেবা খাতে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ কাজ করলেও তাঁদের বড় একটি অংশ অনিরাপদ ও কম উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত।

তাই এআইয়ের আগমনকে শুধু চাকরি হারানোর সংকট হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত।

শ্রম অধিকার ও গবেষণাভিত্তিক সংস্থা বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদের মতে, অটোমেশনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো প্রস্তুতি এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের পরিকল্পনার অভাব।

তাঁর মতে, সরকার, শিল্পমালিক, শ্রমিক সংগঠন, ব্যাংক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। অটোমেশনের আগে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি কর্মহীন মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থাও করতে হবে।

সবশেষে বিশ্বব্যাংকের মূল বার্তা হলো—বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য নিজস্ব অত্যাধুনিক এআই ব্যবস্থা তৈরি করাই একমাত্র পথ নয়। বরং বিশ্বে ইতিমধ্যে তৈরি হওয়া প্রযুক্তি গ্রহণ করে স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী তা ব্যবহার করাই বেশি বাস্তবসম্মত।

অর্থাৎ এআই বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন কর্মসংস্থান ও দক্ষতার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে উৎপাদনশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, ছোট ব্যবসা এবং নাগরিকসেবায় বড় পরিবর্তনের সুযোগও এনে দিতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগাতে পারে। কারণ এআইয়ের যুগে সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা হয়তো শুধু প্রযুক্তির নয়—প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতার।

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version