বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত সরকার নেয়নি। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৩ আগস্টের একটি সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ আর করবে না বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ—এনটিআরসিএ। একই সভায় ১৮তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৯ হাজার ৮৪২ জনকে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
এ কারণে শিক্ষামন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের সঙ্গে সভার কার্যবিবরণীর সিদ্ধান্তের মধ্যে অমিল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সম্প্রতি আলোচনা শুরু হয়, এনটিআরসিএর কাছ থেকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে দেওয়া হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষাবিদদের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনও প্রতিবাদ জানায়।
এ পরিস্থিতিতে সোমবার রাতে শিক্ষামন্ত্রীর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে অ্যাডমিনের পক্ষ থেকে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। সেখানে মন্ত্রীর বরাত দিয়ে বলা হয়, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডিকে দায়িত্ব দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত সরকার নেয়নি।
পোস্টে আরও বলা হয়, এনটিআরসিএর কার্যক্রম এবং শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, দক্ষ ও কার্যকরভাবে পরিচালনার উপায় নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনা অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে অপতথ্য প্রচার না করার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।
তবে এর আগে ৩ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত একটি সভার কার্যবিবরণীতে শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের উল্লেখ পাওয়া গেছে।
৩ আগস্টের সভায় কী বলা হয়েছিল
৩ আগস্টের সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ আর করবে না এনটিআরসিএ। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম নেওয়ার কথাও কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন শিক্ষামন্ত্রী। উপস্থিত ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক, এনটিআরসিএর চেয়ারম্যান অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা আলিফ রুদাবাসসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০৫’ অনুযায়ী এনটিআরসিএ এখন থেকে শুধু নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের কাজ করবে। সেখানে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৫ সালের পরিপত্র অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করবে না।
অর্থাৎ সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএর বর্তমান সুপারিশ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছে।
১৮তম নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৯ হাজার ৮৪২ জনের নিয়োগ
ওই সভায় ১৮তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের নিয়োগের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ১৮তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৯ হাজার ৮৪২ জন তাঁদের পছন্দ অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে নিয়োগ পাবেন।
এ জন্য প্রয়োজনীয় পরিপত্র বা প্রজ্ঞাপন সংশোধন অথবা জারি করার কথাও সভার সিদ্ধান্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন এনটিআরসিএর একজন কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, ৩ আগস্টের বৈঠকে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় থেকে এখনো এনটিআরসিএতে আনুষ্ঠানিক কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
তাহলে বাস্তবে কী হচ্ছে
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিষয়টির দুটি দিক সামনে এসেছে। একদিকে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য হলো—ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত সরকার নেয়নি। অন্যদিকে ৩ আগস্টের সভার কার্যবিবরণীতে এনটিআরসিএর শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ বন্ধ এবং ১৮তম নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে নিয়োগের সিদ্ধান্তের উল্লেখ রয়েছে।
তবে কার্যবিবরণীতে থাকা সিদ্ধান্ত এবং বাস্তবে কার্যকর হওয়া সিদ্ধান্ত এক বিষয় নয়। এনটিআরসিএর কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, এখনো সংশ্লিষ্ট সংস্থায় এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পৌঁছায়নি।
ফলে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের বর্তমান পদ্ধতি শেষ পর্যন্ত পরিবর্তন হচ্ছে কি না, হলে পরিবর্তনটি কীভাবে কার্যকর হবে এবং ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির ভূমিকা কতটা বাড়বে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়।
এনটিআরসিএ ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর বেসরকারি শিক্ষকদের নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি নিয়োগের সুপারিশ প্রক্রিয়ার সঙ্গেও যুক্ত। তাই নিয়োগের সুপারিশের দায়িত্বে পরিবর্তন এলে দেশের বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা বা পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকেই নজর সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, চাকরিপ্রার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর।



