দুর্গাপূজা সামনে রেখে আবারও আলোচনায় এসেছে ভারতে বাংলাদেশের ইলিশ রপ্তানি। এবার ইলিশ রপ্তানির অনুমতি চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে দেশের ১৮টি প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানির সুযোগ দিতে অনুরোধ জানিয়েছে ভারতের ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন। তবে শেষ পর্যন্ত রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রপ্তানিকারকদের আবেদন পাওয়ার পর দেশে ইলিশের বর্তমান সরবরাহ ও চাহিদা পরিস্থিতি জানতে বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে মতামত চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ওই মন্ত্রণালয়ের মতামত পাওয়ার পরই ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খান জানিয়েছেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতামত পাওয়ার পর দ্রুতই অনুমতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে রপ্তানির পক্ষে ইতিবাচক মতামত আসবে বলেও আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
গত বছরও দুর্গাপূজা উপলক্ষে ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। সে সময় মোট ১ হাজার ২০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হলেও বাস্তবে রপ্তানি হয়েছিল মাত্র ১৫০ টন। অর্থাৎ অনুমোদিত পরিমাণের বড় অংশই শেষ পর্যন্ত ভারতে পাঠানো সম্ভব হয়নি।
এবার বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা শুধু ইলিশ রপ্তানির অনুমতি নয়, অনুমতির সময়সীমাও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। আগের বছরগুলোর মতো অল্প সময়ের পরিবর্তে অন্তত দুই মাস এবং সম্ভব হলে সারা বছর ইলিশ রপ্তানির সুযোগ চান তাঁরা।
রপ্তানিকারকদের যুক্তি, মাত্র ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে পুরো রপ্তানি প্রক্রিয়া শেষ করা কঠিন। এই সময়ের মধ্যে ঋণপত্র বা এলসি খোলা, বাজার থেকে প্রয়োজনীয় ইলিশ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং এবং রপ্তানির অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়। ফলে অনুমোদন পাওয়া গেলেও নির্ধারিত পরিমাণ ইলিশ রপ্তানি করা সম্ভব হয় না।
এ বছর রপ্তানির অনুমতি চাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে খুলনার বিশ্বাস এন্টারপ্রাইজ; চট্টগ্রামের জেএস এন্টারপ্রাইজ ও আনরাজ ফিশ প্রোডাক্টস; যশোরের লাকি এন্টারপ্রাইজ, এমইউসি ফুডস, মোহতাব অ্যান্ড সন্স ও জনতা ফিশ।
ঢাকা থেকে আবেদন করেছে ভিজিল্যান্ট এক্সপ্রেস, স্বর্ণালী এন্টারপ্রাইজ, ম্যাজেস্টিক এন্টারপ্রাইজ ও বিডিএস করপোরেশন। এ ছাড়া বরিশালের মহিমা এন্টারপ্রাইজ, এআর এন্টারপ্রাইজ ও তানিশা এন্টারপ্রাইজ; ভোলার রাফিদ এন্টারপ্রাইজ এবং সাতক্ষীরার এম এ এন্টারপ্রাইজ ও সুমন ট্রেডার্সও অনুমতি চেয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের ইলিশ পেতে ভারতের ব্যবসায়ীরাও সক্রিয় হয়েছেন। দেশটির ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পৃথক চিঠি পাঠিয়ে ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। সংগঠনটি সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে রপ্তানির অনুমোদন দেওয়ার অনুরোধ করেছে।
ভারতীয় সংগঠনটির দাবি, ১৯৯৬ সাল থেকে বাংলাদেশ প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৫ হাজার টন ইলিশ ভারতে রপ্তানি করত। পরবর্তী সময়ে রপ্তানিতে বিরতি এলেও ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে দুর্গাপূজা উপলক্ষে সীমিত সময়ের বিশেষ অনুমতির মাধ্যমে আবার ভারতে ইলিশ পাঠানো শুরু হয়।
তবে গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশ সরকার যে পরিমাণ ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে, বাস্তবে তার তুলনায় অনেক কম মাছ ভারতে গেছে। দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৯ সালে ৫০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়। পরের বছর ২০২০ সালে অনুমোদনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৮৫০ টন।
২০২১ সালে ৪ হাজার ৬০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হলেও বাস্তবে যায় ১ হাজার ২০০ টন। ২০২২ সালে ২ হাজার ৯০০ টনের অনুমতির বিপরীতে রপ্তানি হয় ১ হাজার ৩০০ টন। ২০২৩ সালেও একই প্রবণতা দেখা যায়। সে বছর ৩ হাজার ৯৫০ টন ইলিশ পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হলেও ভারতে রপ্তানি হয় ১ হাজার ৩০০ টন।
২০২৪ সালে অনুমোদনের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৪২০ টন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভারতে যায় মাত্র ৫৭৭ টন ইলিশ। গত বছর ১ হাজার ২০০ টনের অনুমোদনের বিপরীতে রপ্তানি আরও কমে মাত্র ১৫০ টনে দাঁড়ায়।
এবারও তাই অনুমতি মিললেও কত পরিমাণ ইলিশ শেষ পর্যন্ত ভারতে যাবে, তা নির্ভর করবে অনুমোদনের পরিমাণ ও সময়সীমাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর। আপাতত মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতামতের অপেক্ষায় রয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সেই মতামত পাওয়ার পরই দুর্গাপূজা সামনে রেখে ভারতে বাংলাদেশের ইলিশ রপ্তানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে।


