মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ঘিরে কয়েক সপ্তাহের অস্থিরতার পর বিশ্ববাজারে টানা কমছে অপরিশোধিত তেলের দাম। বুধবার এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ০ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ দশমিক ৪৩ ডলারে নেমে আসে। এর মাধ্যমে টানা ছয় সেশনে দরপতনের পথে রয়েছে ব্রেন্ট, যা ২০২৫ সালের আগস্টের পর সবচেয়ে দীর্ঘ পতনের ধারা। ছয় সেশনে ব্রেন্টের দাম সাড়ে ৯ শতাংশের বেশি কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআইয়ের দামও একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের নিচে নেমে আসে। বুধবারের লেনদেনে ডব্লিউটিআই প্রায় ৮৯ ডলারের ঘরে নেমেছিল। তেলের বাজারে এই দ্রুত পরিবর্তনের পেছনে মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির প্রত্যাশা এবং কূটনৈতিক তৎপরতাকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।
দাম কমার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন পুনরায় চালু করার উদ্যোগ। ড্রোন হামলার কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইনটিতে আবার তেল পরিবহন শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে সৌদি আরব পূর্বাঞ্চল থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল নিয়ে যেতে পারে এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর কারণে পাইপলাইনটি এখনই পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনাও বাজারে সরবরাহ-ঝুঁকির আশঙ্কা কিছুটা কমিয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার সম্ভাবনার কথা সামনে এসেছে, যদিও এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ ও অবরোধ কমানোর শর্ত যুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি এবং সংঘাতের দ্রুত অবসান ঘটবে—এমন নিশ্চয়তাও নেই।
তেলের দরপতনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারেও প্রযুক্তি খাতের শক্তিশালী অবস্থান দেখা গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ঘিরে বিনিয়োগকারীদের আশাবাদ এবং মধ্যপ্রাচ্যে আলোচনার সম্ভাবনার মধ্যে মঙ্গলবার নাসডাক সূচক লেনদেনের একপর্যায়ে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। তবে বৃহত্তর বাজারে চিত্র ছিল মিশ্র।
বাজারের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক। দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক সামনে রেখে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও ভূরাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতে কী সিদ্ধান্ত আসে, সেদিকেও নজর রাখছেন বিনিয়োগকারীরা। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক চীনের অর্থনীতি ও জ্বালানি চাহিদার পরিবর্তন আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে বড় প্রভাব ফেলে।
তবে বর্তমান দরপতন দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে এখনো যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আবার তীব্র হলে কিংবা তেল উৎপাদন ও রপ্তানি অবকাঠামোয় নতুন হামলা হলে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ দ্রুত ফিরে আসতে পারে। ফলে কয়েক দিনের মধ্যে তেলের দাম আবার বড় ধরনের ওঠানামার মুখে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বিশ্ববাজারে ব্রেন্টের দাম ৯৮ দশমিক ৪৩ ডলার হলে টাকায় প্রতি লিটার অপরিশোধিত তেলের মূল্য কত দাঁড়ায়।
এক ব্যারেলে প্রায় ১৫৯ লিটার তেল থাকে। সেই হিসাবে ৯৮ দশমিক ৪৩ ডলারের এক ব্যারেল তেলের প্রতি লিটারের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য প্রায় ৬২ সেন্ট। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে হিসাব করলে প্রতি লিটার অপরিশোধিত তেলের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৭৬ টাকা।
তবে এই ৭৬ টাকা দেশের পেট্রলপাম্পে বিক্রি হওয়া জ্বালানির দাম নয়। এটি শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের আনুমানিক মূল্য। তেল বাংলাদেশে আনার পর এর সঙ্গে জাহাজভাড়া, বিমা, বন্দর ব্যয়, পরিশোধন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিতরণ ব্যয় যুক্ত হয়। এর পাশাপাশি রয়েছে সরকারের শুল্ক ও কর।
বাংলাদেশের আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো পরিশোধন সক্ষমতা। দেশে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে, অথচ বছরে মোট তেল আমদানির পরিমাণ প্রায় ৭০ লাখ টন। ফলে চাহিদার বড় অংশ মেটাতে সরাসরি পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করতে হয়। তাই শুধু ব্রেন্টের অপরিশোধিত তেলের দর দিয়ে দেশের পেট্রল, অকটেন বা ডিজেলের বাজারদর নির্ধারণ করা যায় না।
তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম যদি দীর্ঘ সময় ধরে কম থাকে, তাহলে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয়ের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। আপাতত বাজারের নজর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনীতি, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এবং সৌদি আরবের বিকল্প পথে তেল রপ্তানি কতটা স্বাভাবিক হয়—এসব বিষয়ের ওপর।


