আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় নাক দিয়ে পানি পড়া, হাঁচি, গলাব্যথা কিংবা কাশি—এসব সমস্যা খুবই পরিচিত। সাধারণ সর্দি মূলত ভাইরাসজনিত শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ। রাইনোভাইরাসসহ বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস এর জন্য দায়ী হতে পারে। তবে সাধারণ সর্দি ও ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু এক বিষয় নয়। ফ্লু ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের কারণে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ সর্দির তুলনায় জ্বর, শরীরব্যথা ও দুর্বলতা বেশি হতে পারে।
সর্দি-কাশির ভাইরাস সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি থেকে বের হওয়া শ্বাসতন্ত্রের কণা এবং ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। ভাইরাসযুক্ত কোনো বস্তু বা স্থান স্পর্শ করার পর নাক, চোখ বা মুখে হাত দিলেও কিছু ভাইরাস ছড়ানোর সুযোগ থাকে। তবে শুধু ঠান্ডা আবহাওয়া বা ধুলাবালু সরাসরি ভাইরাসজনিত সর্দির কারণ নয়। নির্দিষ্ট মৌসুমে কিছু শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে।
সাধারণ সর্দিতে নাক দিয়ে পানি পড়া বা নাক বন্ধ হওয়া, হাঁচি, গলা খুসখুস বা ব্যথা এবং কাশি হতে পারে। এর সঙ্গে মাথাব্যথা, শরীর ম্যাজম্যাজ করা, ক্লান্তি এবং কখনো মৃদু জ্বরও দেখা দিতে পারে। কারও চোখ দিয়ে পানি পড়ার মতো সমস্যাও হতে পারে।
বেশির ভাগ সাধারণ সর্দি নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়। উপসর্গ সাধারণত এক সপ্তাহের মধ্যে অনেকটা কমে আসে, যদিও কাশি কিছু ক্ষেত্রে আরও কিছুদিন থাকতে পারে। এই সময়ে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া, পানি ও অন্যান্য তরল পান করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উপসর্গ কমানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
গলাব্যথা বা অস্বস্তিতে হালকা গরম লবণপানি দিয়ে গার্গল সাময়িক আরাম দিতে পারে। নাক বন্ধ থাকলে গরম পানির বাষ্প কিছু মানুষের ক্ষেত্রে স্বস্তি দিতে পারে, তবে অতিরিক্ত গরম পানি ব্যবহার করলে দগ্ধ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এক বছরের বেশি বয়সীদের কাশিতে মধু কিছুটা আরাম দিতে পারে। এক বছরের কম বয়সী শিশুকে মধু দেওয়া উচিত নয়।
জ্বর বা শরীরব্যথার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের নির্দেশনা বা ওষুধের লেবেল অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে। অ্যান্টিহিস্টামিন বা অন্য সর্দির ওষুধ সবার জন্য সমানভাবে উপযুক্ত নয়। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী এবং অন্য রোগের ওষুধ গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
কাশির ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন ওষুধ ব্যবহার করা হলেও নিজের ইচ্ছামতো একাধিক কাশি-সর্দির ওষুধ একসঙ্গে খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ, কিছু কম্বিনেশন ওষুধে একই উপাদান থাকতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অ্যান্টিবায়োটিক। সাধারণ সর্দি ভাইরাসজনিত হওয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক এতে কাজ করে না। কফ হলুদ বা সবুজ হলেই যে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হয়েছে এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন—এমনও নয়। ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শেই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা উচিত।
ভিটামিন সি ও জিংককে অনেক সময় রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর উপায় হিসেবে প্রচার করা হয়। কিন্তু এগুলো সাধারণ সর্দির নিশ্চিত চিকিৎসা নয়। বিশেষ করে উচ্চমাত্রায় বা দীর্ঘদিন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সাধারণ সর্দি-কাশি হলেও কিছু লক্ষণকে অবহেলা করা উচিত নয়। শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, বুকে ব্যথা, গুরুতর দুর্বলতা, পানিশূন্যতার লক্ষণ, খুব বেশি বা দীর্ঘস্থায়ী জ্বর কিংবা অবস্থার ক্রমাগত অবনতি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। কয়েক সপ্তাহ ধরে কাশি থাকলেও কারণ জানতে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি কিংবা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকা দরকার।
সংক্রমণ প্রতিরোধেও কিছু সাধারণ অভ্যাস কার্যকর। নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, অপরিষ্কার হাতে চোখ-নাক-মুখ স্পর্শ না করা, হাঁচি বা কাশির সময় টিস্যু কিংবা কনুই দিয়ে মুখ-নাক ঢেকে রাখা এবং অসুস্থ ব্যক্তির সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এড়িয়ে চলা সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমাতে পারে।
পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার এবং পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ শরীরকে সুস্থ থাকতে সহায়তা করে। তবে সর্দি-কাশি দীর্ঘস্থায়ী হলে বা স্বাভাবিকের তুলনায় গুরুতর মনে হলে শুধু ঘরোয়া প্রতিকারের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।



