বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পাটপণ্যের ওপর অ্যান্টিডাম্পিং শুল্কের হার নতুন করে নির্ধারণ করেছে ভারত। নতুন ব্যবস্থায় সব বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য একই হারে শুল্ক রাখা হয়নি। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও পণ্যের ধরন অনুযায়ী আলাদা শুল্কহার নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে ভারতের বাজারে পাটপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট উৎপাদনকারীর তালিকায় থাকা এখন বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব বিভাগ গত ২৪ সেপ্টেম্বর এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এতে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি করা পাটের সুতা বা টুইন, হেসিয়ান কাপড়, পাটের স্যাকিং ব্যাগ ও স্যাকিং ক্লথের ওপর নতুন অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে ৫৫টি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করে পণ্যভেদে আলাদা শুল্কহার দেওয়া হয়েছে। তবে এই তালিকার বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য শুল্ক তুলনামূলক বেশি।
তালিকাভুক্ত ৫৫ প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য কোনো উৎপাদনকারীর পাটের সুতা বা টুইন ভারতে রপ্তানি করা হলে প্রতি টনে সর্বোচ্চ ৪৪৫ ডলার অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক দিতে হবে। একইভাবে হেসিয়ান কাপড়ে টনপ্রতি ৮৮ ডলার এবং স্যাকিং ব্যাগে ২৮৩ ডলার শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
নির্ধারিত কম শুল্কের সুবিধা পেতে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কিছু শর্তও রাখা হয়েছে। রপ্তানির সময় বৈধ বাণিজ্যিক চালান দেখাতে হবে এবং ওই চালানে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানই পণ্যটি উৎপাদন করেছে—এমন ঘোষণা থাকতে হবে। প্রয়োজনীয় ঘোষণা না থাকলে তালিকার বাইরে থাকা অন্যান্য উৎপাদনকারীর জন্য নির্ধারিত শুল্কহার প্রযোজ্য হবে।
তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও শুল্কের পরিমাণ এক নয়। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট পণ্যে শুল্ক শূন্য রাখা হয়েছে। এএম জুট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের পাটের সুতা বা টুইনে কোনো অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক রাখা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির হেসিয়ান কাপড়েও শুল্ক শূন্য।
আশা জুট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের পাটের সুতায় প্রতি টনে ৫৯ ডলার এবং স্যাকিং ব্যাগে ৯৪ ডলার শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। নাটোর জুট মিলসের পাটের সুতায় টনপ্রতি ১০৭ ডলার শুল্ক থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির স্যাকিং ব্যাগে শুল্ক শূন্য।
সুপার জুট মিলস লিমিটেডের পাটের সুতায় প্রতি টনে ১৩৯ ডলার এবং স্যাকিং ব্যাগে ১৫৫ ডলার শুল্ক দিতে হবে।
হাসান জুট মিলস লিমিটেড ও হাসান জুট অ্যান্ড স্পিনিং মিলস লিমিটেডের পাটের সুতায় টনপ্রতি ৬৯ ডলার এবং স্যাকিং ব্যাগে ১২০ ডলার করে শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
একইভাবে জনতা জুট মিলস লিমিটেডের পাটের সুতায় ৬৯ ডলার ও স্যাকিং ব্যাগে ১২০ ডলার শুল্ক রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির হেসিয়ান কাপড়ে কোনো শুল্ক রাখা হয়নি।
সাদাত জুট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের পাটের সুতায় ৬৯ ডলার এবং স্যাকিং ব্যাগে ১২০ ডলার শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। সাগর জুট স্পিনিং মিলস লিমিটেড এবং সিডল অ্যান্ড টেক্সটাইলস (বাংলাদেশ) লিমিটেডের ক্ষেত্রেও একই হারে শুল্ক প্রযোজ্য হবে।
হেসিয়ান কাপড়ের ক্ষেত্রে আফিল জুট উইভিং মিলস লিমিটেড ও আলিনা জুট মিলস লিমিটেডের জন্য প্রতি টনে ৮৮ ডলার শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। রাজবাড়ী জুট মিলস লিমিটেডের পাটের সুতায় ৬৯ ডলার এবং হেসিয়ান কাপড়ে ৮৮ ডলার শুল্ক রাখা হয়েছে।
নতুন এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান তাপস প্রামাণিক বলেছেন, এর বিশেষ তাৎপর্য নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আগে যেসব প্রতিষ্ঠান সুবিধা পেত, তাদের মধ্যে অনেকে এবার বাদ পড়েছে। আবার নতুন কিছু প্রতিষ্ঠান তালিকায় যুক্ত হয়েছে। কীভাবে বা কোন বিবেচনায় এসব পরিবর্তন করা হয়েছে, সে বিষয়ে তাঁর ধারণা নেই। তাঁর মতে, আগে এই খাতে ভর্তুকি থাকলেও বর্তমানে তা না থাকায় এ ধরনের শুল্কের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বাংলাদেশ ও নেপালের পাটপণ্যের ওপর অ্যান্টিডাম্পিং শুল্কের এই পরিবর্তনের আগে মধ্যবর্তী পর্যালোচনা করেছিল ভারতের ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ট্রেড রেমেডিজ বা ডিজিটিআর। সংস্থাটি ২০২৫ সালের ৩০ জুন এই পর্যালোচনা শুরু করে। পর্যালোচনা শেষে চলতি বছরের ২৫ জুন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয় ডিজিটিআর।
সেই সিদ্ধান্তে অবশিষ্ট সময়ের জন্য বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি করা বিভিন্ন পাটপণ্যের অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক পুনর্নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়। ডিজিটিআরের সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব বিভাগ ২৪ সেপ্টেম্বর নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা জুট স্যাকিং ব্যাগের জন্য যে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে, একই শুল্ক জুট স্যাকিং ক্লথের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। তবে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট ১০টি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের তৈরি স্যাকিং ক্লথকে এই শুল্কের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
নতুন শুল্ককাঠামোর ফলে ভারতের বাজারে বাংলাদেশের পাটপণ্য রপ্তানিতে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ও প্রয়োজনীয় বাণিজ্যিক নথিপত্র আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে তালিকার বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানের পাটের সুতায় টনপ্রতি ৪৪৫ ডলার পর্যন্ত শুল্ক থাকায় তালিকাভুক্ত ও তালিকাবহির্ভূত প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি ব্যয়ে বড় পার্থক্য তৈরি হতে পারে।

