যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধের জেরে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা। সাধারণত এমন অনিশ্চয়তার সময়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার চাহিদা বাড়তে দেখা যায়। কিন্তু এবার ঘটছে উল্টো ঘটনা। বিশ্ববাজারে সোনার দাম বাড়ার পরিবর্তে কমে সাত সপ্তাহের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি নেমে এসেছে।
সোমবার স্পট মার্কেটে সোনার দাম ৩ দশমিক ৩ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১৪৬ দশমিক ৫১ ডলারে নেমে আসে। একপর্যায়ে দাম ৫ আগস্টের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সোনার ফিউচার বা আগাম সরবরাহ চুক্তির দামও ৩ দশমিক ৩ শতাংশ কমে আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ১৭৮ দশমিক ৪০ ডলারে নেমে যায়।
মঙ্গলবারও সোনার বাজারে চাপ অব্যাহত রয়েছে। দিনের লেনদেনে দাম কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও প্রতি আউন্স প্রায় ৪ হাজার ১৪০ ডলারের আশপাশে অবস্থান করছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবান ধাতুটির দাম এখনো সাম্প্রতিক নিম্নস্তরের কাছাকাছি রয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, যুদ্ধ ও মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়লেও সোনার দাম কমছে কেন?
এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডের সুদহার বৃদ্ধি, শক্তিশালী মার্কিন ডলার এবং ভবিষ্যতে আরও সুদহার বাড়ার প্রত্যাশা। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ আরও কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করতে পারে বলে ধারণা করছেন বিনিয়োগকারীরা।
সোনা সাধারণত মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষামূলক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু সোনা থেকে নিয়মিত কোনো সুদ পাওয়া যায় না। বিপরীতে ট্রেজারি বন্ডের মতো সম্পদে সুদ পাওয়া যায়। ফলে সুদহার ও বন্ডের রিটার্ন বাড়লে অনেক বিনিয়োগকারী সোনা থেকে অর্থ সরিয়ে সুদ পাওয়া যায় এমন সম্পদের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
মেরিল্যান্ডভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান পোয়েজ ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইজার্সের প্রধান নির্বাহী শরিফ ওথমানের মতে, সাধারণ মানুষের জীবনে সোনার এই দরপতনের প্রত্যক্ষ প্রভাব খুব বেশি না-ও হতে পারে। তবে যাঁরা বিনিয়োগ হিসেবে সোনা কিনেছেন, তাঁরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। তাঁর ব্যাখ্যা, সোনা থেকে সুদ পাওয়া যায় না বলেই ট্রেজারি বন্ডের সুদহার বাড়লে সোনার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ কমে যায়।
চলতি সেপ্টেম্বরের শুরুতে ফেড নীতি সুদহার ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট বাড়িয়েছে। পাশাপাশি সামনে আরও সুদহার বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে বাজারে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে মার্কিন ডলারও দুই মাসের মধ্যে শক্তিশালী অবস্থানের কাছাকাছি রয়েছে। শক্তিশালী ডলার সাধারণত সোনার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে, কারণ অন্য মুদ্রার ক্রেতাদের কাছে ডলারে মূল্যায়িত সোনা তুলনামূলক ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে তেলের বাজারের অস্থিরতাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। সংঘাত নিরসন ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা ঘিরে অনিশ্চয়তার মধ্যে তেলের দাম বেড়েছে। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ বাড়তে পারে। আর সেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার দীর্ঘ সময় উঁচু থাকার আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত সোনার ওপর চাপ তৈরি করছে।
আমেরিকান গোল্ড এক্সচেঞ্জের বাজার বিশ্লেষক জিম উইকফও উচ্চ ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ও শক্তিশালী ডলারকে মূল্যবান ধাতুর দাম কমার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
শুধু সোনা নয়, অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। সোমবার স্পট মার্কেটে রুপার দাম ৪ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছিল। প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের দামও কমে যায়। মঙ্গলবারও রুপা ও প্লাটিনামের ওপর চাপ দেখা গেছে।
সব মিলিয়ে যুদ্ধের অনিশ্চয়তা এবার সোনার জন্য প্রচলিত ‘নিরাপদ বিনিয়োগ’ সুবিধা তৈরি করার বদলে ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তেলের মূল্যবৃদ্ধি থেকে মূল্যস্ফীতির ভয়, সেখান থেকে আরও সুদহার বৃদ্ধির প্রত্যাশা এবং একই সঙ্গে শক্তিশালী ডলার ও বন্ডের উচ্চ রিটার্ন—এই কয়েকটি কারণই এখন বিশ্ববাজারে সোনার দামকে চাপে রেখেছে।

