ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলেই যে প্রত্যেক রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে, এমন নয়। রোগীর শারীরিক অবস্থা ও জটিলতার ঝুঁকি বিবেচনা করে চিকিৎসক অনেক সময় বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিতে পারেন। তবে বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়া মানে ঝুঁকি কমে গেছে—এমনটা ভাবার সুযোগ নেই। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং বিপদচিহ্ন সম্পর্কে সতর্ক থাকা খুবই জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু রোগীর হাসপাতালে ভর্তি থাকা প্রয়োজন কি না, কত দিন পরপর রক্ত পরীক্ষা করতে হবে কিংবা কখন ফলোআপ করতে হবে—এসব সিদ্ধান্ত চিকিৎসকই নেবেন। কোনো জটিলতা না থাকলে এবং দ্রুত জটিলতা তৈরির আশঙ্কা কম থাকলে রোগীকে বাড়িতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া যেতে পারে।
তবে বাড়িতে থাকা অবস্থায় রোগীর শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে কি না, সেটি নিয়মিত খেয়াল রাখতে হবে।
প্রথমেই প্রয়োজন পূর্ণ বিশ্রাম। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীকে যতটা সম্ভব শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলতে হবে। শুধু শরীর নয়, চোখকেও বিশ্রাম দিতে হবে। একই সঙ্গে রোগীকে সব সময় মশারির মধ্যে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণ ডেঙ্গুর ভাইরাস বহনকারী মশা আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ানোর পর অন্য মানুষকেও সংক্রমিত করতে পারে।
খাবারের ক্ষেত্রেও সতর্কতা জরুরি। সহজপাচ্য খাবার খেতে হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ করতে হবে, বিশেষ করে লবণসমৃদ্ধ তরল। তবে সবার শরীরে একই পরিমাণ তরল প্রয়োজন হয় না। বয়স ও শারীরিক অবস্থার ওপর প্রয়োজন নির্ভর করে। আবার কিছু রোগীর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বা নির্দিষ্ট ধরনের লবণাক্ত তরল গ্রহণে নিষেধাজ্ঞাও থাকতে পারে। তাই এ বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
ডেঙ্গু রোগীর জ্বরের তাপমাত্রা নিয়মিত মাপা এবং তারিখ ও সময়সহ লিখে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এতে রোগীর অবস্থার পরিবর্তন বুঝতে চিকিৎসকের জন্যও সুবিধা হয়।
জ্বর বেশি থাকলে কুসুম গরম পানি দিয়ে শরীর মোছা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে কারও সহায়তা নিয়ে অল্প সময় কুসুম গরম পানিতে গোসলও করা যায়। তবে দুর্বল রোগীকে একা বাথরুমে পাঠানো ঠিক নয়। পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে ওয়াশরুমে যাওয়ার সময় প্রয়োজনে কাউকে সঙ্গে রাখতে হবে।
জ্বর বা শরীরে ব্যথা থাকলে প্যারাসিটামল সেবন করা যেতে পারে। তবে নির্ধারিত মাত্রার বেশি প্যারাসিটামল নেওয়া যাবে না। ডেঙ্গুতে ব্যথা বা জ্বর কমানোর জন্য নিজের ইচ্ছায় অন্য ধরনের ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়াও বিপজ্জনক হতে পারে।
বিশেষ করে আইবুপ্রফেন, ন্যাপ্রোক্সেনসহ অন্যান্য নন-স্টেরয়ডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ওষুধ এড়িয়ে চলতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া স্টেরয়েড বা অ্যান্টিবায়োটিকও গ্রহণ করা উচিত নয়।
রোগীর প্রস্রাবের পরিমাণ ও রংয়ের দিকেও নজর রাখতে হবে। এর পাশাপাশি ডেঙ্গুর সম্ভাব্য বিপদচিহ্নগুলো সম্পর্কে পরিবারের সদস্যদের সচেতন থাকতে হবে। রোগীর আগে থেকেই যদি অ্যাসপিরিন বা রক্ত পাতলা করার কোনো ওষুধ সেবনের ইতিহাস থাকে, সেটিও চিকিৎসককে জানাতে হবে।
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জ্বর কমে গেলেই যে রোগী বিপদমুক্ত, তা নয়। তাই জ্বর চলে যাওয়ার পরও চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী রোগীকে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।
অনেক সময় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর প্লেটলেট কমে গেলে পরিবারে আতঙ্ক তৈরি হয়। কিন্তু শুধু প্লেটলেটের সংখ্যা দেখেই রোগীর অবস্থা নির্ধারণ করা যায় না। চিকিৎসক রোগীর শারীরিক পরীক্ষা, রক্তের বিভিন্ন উপাদানের মাত্রা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য পরীক্ষার ফলাফল বিবেচনা করে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেন। তাই শুধু প্লেটলেট কমেছে বলে আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা জরুরি।
আরেকটি বিষয় হলো ঘরোয়া টোটকা। ডেঙ্গু রোগীর প্লেটলেট বাড়ানোর আশায় পেঁপেপাতার রস বা এ ধরনের অন্যান্য ঘরোয়া উপায় ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
একইভাবে বাড়িতে নিজের সিদ্ধান্তে শিরাপথে স্যালাইন দেওয়াও ঠিক নয়। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত তরল গ্রহণ করাও এড়িয়ে চলতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়া রোগীকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা এবং চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা। কখন রক্ত পরীক্ষা করতে হবে, কখন হাসপাতালে যেতে হবে কিংবা চিকিৎসায় কোনো পরিবর্তন প্রয়োজন কি না—এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী।
অর্থাৎ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি না থাকলেও চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের বাইরে নয়। বিশ্রাম, পরিমিত তরল, সহজপাচ্য খাবার, জ্বরের হিসাব রাখা, মশারি ব্যবহার এবং বিপদচিহ্ন সম্পর্কে সচেতন থাকা—বাড়িতে থাকা রোগীর যত্নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর জ্বর কমে যাওয়ার পরও সতর্কতা চালিয়ে যেতে হবে, কারণ এই সময়েও জটিলতা দেখা দিতে পারে।


