ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন। শনিবার শুরু হওয়া দুই দিনের এই সম্মেলনে যোগ দিতে এরই মধ্যে দিল্লিতে জড়ো হয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা। সম্মেলন ঘিরে রাজধানীজুড়ে নেওয়া হয়েছে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা।
পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর বিপরীতে বিকল্প শক্তি হিসেবে গত কয়েক বছরে ব্রিকসের গুরুত্ব বেড়েছে। সদস্যদেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে সহযোগিতা বাড়ানো এবারের সম্মেলনের অন্যতম লক্ষ্য।
তবে এমন এক সময়ে ব্রিকস নেতারা বৈঠকে বসেছেন, যখন সদস্যদেশগুলোর সামনে রয়েছে একাধিক ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইয়েমেন ঘিরে উত্তেজনা, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধ—এসব বিষয় সদস্যদেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যও তৈরি করেছে।
বর্তমানে ব্রিকসের সদস্যসংখ্যা ১১। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি জোটে রয়েছে মিসর, ইথিওপিয়া, সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইন্দোনেশিয়া। এসব দেশ সম্মিলিতভাবে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৯ শতাংশ এবং বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।
এবারের সম্মেলনে আয়োজক ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাশাপাশি যোগ দিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা। সাত বছর পর চীনের প্রেসিডেন্টের ভারত সফর হওয়ায় সি চিন পিংয়ের উপস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভা এবারের সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন না। তাঁর পরিবর্তে ব্রাজিলের প্রতিনিধিত্ব করছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েইরা।
সম্মেলনে আরও অংশ নিচ্ছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো এবং ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা যোগ দিয়েছেন।
ব্রিকসের সদস্যদের বাইরে মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, কাজাখস্তান, নাইজেরিয়া, উগান্ডা, কিউবা, উরুগুয়ে ও বাহরাইনসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা নয়াদিল্লিতে এসেছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মহাপরিচালক এনগোজি ওকোনজো-ইওয়েলাও সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।
এবারের সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানো। বিশেষ করে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে আন্তসীমান্ত লেনদেনের বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
সম্মেলনের সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। তার ঠিক আগে ব্রিকস নেতাদের এই বৈঠক আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এবারের ব্রিকস সম্মেলনের প্রতিপাদ্যে সহনশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে আলোচনার কেন্দ্রে শেষ পর্যন্ত অর্থনীতি নাকি চলমান যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব জায়গা করে নেয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে বিশ্বের।


