একসময় ছিলেন আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট। রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সেই মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহকেই জীবনের শেষ চার বছর কাটাতে হয়েছিল কাবুলে জাতিসংঘের একটি কম্পাউন্ডে। বাইরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না, দেশ ছাড়ার পথও বন্ধ। শেষ পর্যন্ত সেই আশ্রয়ও তাঁর জীবন রক্ষা করতে পারেনি।
১৯৯৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর কাবুল দখল করে তালেবান। ওই রাতেই জাতিসংঘের স্থায়ী মিশনের কম্পাউন্ডে প্রবেশ করে নাজিবুল্লাহ ও তাঁর ভাইকে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েক ঘণ্টা পর কাবুলের কেন্দ্রস্থলে একটি ল্যাম্পপোস্টে তাঁদের মরদেহ ঝুলতে দেখা যায়।
আফগানিস্তানের দীর্ঘ সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ইতিহাসে নাজিবুল্লাহর এই পরিণতি একটি নির্মম অধ্যায় হয়ে আছে। অথচ কয়েক বছর আগেও তিনি ছিলেন দেশটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের একজন।
সোভিয়েত-সমর্থিত আফগান সরকারের আমলে দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন নাজিবুল্লাহ। একপর্যায়ে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। পরে আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হন তিনি।
তাঁর শাসনামলের বড় একটি অংশজুড়ে চলছিল মুজাহিদিনদের সঙ্গে সোভিয়েত-সমর্থিত সরকারের সংঘাত। সোভিয়েত সেনারা আফগানিস্তান থেকে সরে যাওয়ার পর নাজিবুল্লাহর সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও তিনি আরও কয়েক বছর ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হন।
তবে শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ১৯৯২ সালে মুজাহিদিনদের তীব্র লড়াইয়ের মুখে নাজিবুল্লাহ সরকারের পতন ঘটে। ক্ষমতা হারানোর পর তিনি আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেই চেষ্টা সফল হয়নি।
এরপর আশ্রয় নেন কাবুলে জাতিসংঘের কম্পাউন্ডে। সেখানেই শুরু হয় সাবেক এই প্রেসিডেন্টের সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জীবন। যে মানুষটি একসময় রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন, তাঁকেই তখন সীমিত পরিসরের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছিল।
নাজিবুল্লাহ জাতিসংঘের আশ্রয়ে থাকার সময় আফগানিস্তানের পরিস্থিতিও ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠে। তাঁর সরকারের পতনের পর দেশটিতে স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বরং বিভিন্ন মুজাহিদিন গোষ্ঠী ও জোটের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই চলতে থাকে। সংঘাতে বিপর্যস্ত হতে থাকে কাবুলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই চার বছর জাতিসংঘের আশ্রয়ে ছিলেন নাজিবুল্লাহ। বাইরে তখন আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। একপর্যায়ে নতুন শক্তি হিসেবে উত্থান ঘটে তালেবানের।
১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে তালেবান কাবুলের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ২৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ নেয় তারা। ক্ষমতার এই পালাবদলই নাজিবুল্লাহর জীবনের শেষ অধ্যায় হয়ে ওঠে।
কাবুল দখলের রাতেই জাতিসংঘের কম্পাউন্ড থেকে নাজিবুল্লাহ ও তাঁর ভাইকে জোরপূর্বক বের করে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাঁদের হত্যা করা হয় এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কাবুলের কেন্দ্রস্থলে তাঁদের মরদেহ ঝুলতে দেখা যায়।
চার বছর ধরে আন্তর্জাতিক সংস্থার আশ্রয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা পাননি আফগানিস্তানের সাবেক এই প্রেসিডেন্ট।
নাজিবুল্লাহর হত্যাকাণ্ডকে শুধু একজন ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্টের করুণ পরিণতি হিসেবে দেখলে আফগানিস্তানের সেই সময়ের পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। এর পেছনে ছিল সোভিয়েত-সমর্থিত সরকারের দীর্ঘ উত্তরাধিকার, মুজাহিদিনদের সঙ্গে বছরের পর বছর সংঘাত এবং সরকার পতনের পর আরও চার বছরের গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জটিল ইতিহাস।
ক্ষমতার সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে জাতিসংঘের আশ্রয়ে চার বছরের বন্দিজীবন এবং শেষ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ড—মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহর জীবনের শেষ অধ্যায় আফগানিস্তানের কয়েক দশকের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হয়ে আছে।


