স্বপ্নের ফাইনালে গিয়েও শিরোপা অধরাই রয়ে গেলো লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার। অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয়তায় স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে বিশ্বকাপ হাতছাড়া হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো আর্জেন্টিনা জুড়ে নেমে আসে এক অদ্ভুত নীরবতা, যা কিছুক্ষণের মধ্যেই রূপ নেয় সহিংসতায়। রাজধানী বুয়েনস আইরেসের ঐতিহ্যবাহী উদযাপনস্থল ওবেলিস্কোর সামনে জড়ো হওয়া হাজারো সমর্থকের মধ্যে একটা অংশ ক্ষোভে ফেটে পড়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। কাঁদানে গ্যাস, জলকামান, ভাঙা কাচের বোতল, রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ, সব মিলিয়ে ফাইনালের রাতটাই হয়ে ওঠে উত্তেজনাপূর্ণ এক ঘটনাবহুল অধ্যায়। ঠিক কী ঘটেছিল মাঠে আর মাঠের বাইরে, বিস্তারিত থাকছে প্রতিবেদনে।
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে নির্ধারিত সময়ে কোনো দলই গোলের দেখা পায়নি। ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে, যেখানে দ্বিতীয়ার্ধের ১০৬ মিনিটে নিকো উইলিয়ামসের দুর্দান্ত অ্যাসিস্ট থেকে দলকে জয়সূচক গোল এনে দেন ফেরান তোরেস। এই এক গোলেই নির্ধারিত হয়ে যায় শিরোপার ভাগ্য। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন।
ম্যাচটি ছিল একইসঙ্গে বিতর্কিত ও উত্তপ্ত। খেলা চলাকালীনই লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার এনজো ফের্নান্দেজ। এরপর পুরো ম্যাচ শেষ হওয়ার পরও শেষ হয়নি উত্তেজনা। জয়ের উদযাপনের সময় স্পেনের রদ্রিকে ধাক্কা দেন আর্জেন্টিনার নাহুয়েল মোলিনা, এরপর দুই দলের একাধিক খেলোয়াড় জড়িয়ে পড়েন উত্তেজনায়। সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটান লেয়ান্দ্রো পারেদেস, যিনি ফাইনাল বাঁশি বাজার পরও স্পেনের এরিক গার্সিয়াকে ধাক্কা দিয়ে ও আক্রমণাত্মক আচরণ করে দেখেন লাল কার্ড। কোচ লিওনেল স্কালোনিকে ছুটে এসে পরিস্থিতি সামাল দিতে দেখা যায় মাঠে।
মাঠের এই অস্থিরতার রেশ গিয়ে পড়ে বুয়েনস আইরেসের রাস্তাতেও। ওবেলিস্কোর চারপাশে জড়ো হওয়া হাজারো সমর্থক প্রথমদিকে শান্তিপূর্ণভাবেই খেলা উপভোগ করছিলেন, কিন্তু মধ্যরাতের কিছু আগে একদল সমর্থক নিরাপত্তা বেষ্টনী ভাঙার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি সহিংস রূপ নেয়। পুলিশের দিকে কাচের বোতল ও নানা বস্তু ছোঁড়া হলে জবাবে পুলিশ ব্যবহার করে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান। এক ছবিতে দেখা যায়, মাটিতে পড়ে থাকা এক সমর্থককে লাথি মারছেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা, যা নিয়েও তৈরি হয়েছে সমালোচনা। এই সংঘর্ষে অন্তত পনেরো জনকে আটক করা হয়েছে, আহত হয়েছেন একাধিক মানুষ, যদিও তাদের আঘাতের প্রকৃত মাত্রা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
তবে হারের পরও দলের প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই, তিনি জাতীয় দলের সম্মানে ঘোষণা দিয়েছেন বিশেষ ছুটির দিনের, যদিও নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক করবেন খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফরাই। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই ফাইনালে ট্রফি হস্তান্তর করেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বপ্ন লালন করেছিলেন।
মাঠের লড়াইয়ে হেরে গেলেও এবারের বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত কীর্তিতে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকলেন মেসি, গড়েছেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড। তবে শিরোপা-স্বপ্ন অধরা রাখাটাই যেন শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি পোড়ালো আর্জেন্টাইন সমর্থকদের, আর তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটলো রাজপথের এই সংঘর্ষে।



