দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর শাহবাগ ছিল বিভিন্ন আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে হওয়া বেশিরভাগ আন্দোলনই শেষ হয়েছে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, প্রশাসনের আশ্বাস কিংবা নতুন কর্মসূচির ঘোষণার মধ্য দিয়ে। কিন্তু এবার সেই চিত্রের ব্যতিক্রম দেখা গেল। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সুপারিশপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকরা চাকরিতে যোগদান ও পদায়নের প্রজ্ঞাপনের দাবিতে যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন, সেটি শেষ হয়েছে দাবি পূরণের মধ্য দিয়েই। ফলে দীর্ঘদিন পর শাহবাগ দেখল একটি সফল আন্দোলনের সমাপ্তি।
রোববার সকাল থেকেই জাতীয় জাদুঘরের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা সুপারিশপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকরা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনকারীর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যায়। অনেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন। কারও কোলে ছোট শিশু, আবার কেউ এসেছেন বাবা-মা কিংবা স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে। নিরাপত্তা ও সন্তানের দেখাশোনার প্রয়োজনেই অনেকেই পরিবারকে সঙ্গে এনেছিলেন বলে জানান।
আন্দোলন শুরুর আগেই শাহবাগ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করে পুলিশ। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ব্যারিকেড বসানো হয়, মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য, এপিবিএন এবং জলকামান। তবে আন্দোলনের শুরুতেই ভিন্ন এক দৃশ্য দেখা যায়। আন্দোলনকারীরা পুলিশের হাতে ফুল তুলে দিয়ে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির বার্তা দেন। এরপর জাতীয় সংগীত গেয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন তাঁরা।
সকালের বৃষ্টিও আন্দোলনকারীদের মনোবল ভাঙতে পারেনি। অনেকে ছাতা কিংবা প্ল্যাকার্ড দিয়ে বৃষ্টি থেকে নিজেদের রক্ষা করেন। কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি থেমে প্রচণ্ড রোদ দেখা দিলেও তাঁরা অবস্থান ছাড়েননি। মেট্রোরেলের পিলারের নিচে কিংবা ছাতার আড়ালে দাঁড়িয়ে আন্দোলন চালিয়ে যান। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে কয়েক ঘণ্টার এই অবস্থান কর্মসূচি আন্দোলনকারীদের দৃঢ় অবস্থানেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
আন্দোলনের কারণে শাহবাগের প্রধান সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। যদিও শাহবাগ থানার পাশের সড়কটি সীমিত আকারে খোলা রাখা হয়েছিল, তবুও নগরবাসীকে ভোগান্তি পোহাতে হয়। তবে আন্দোলনকারীরা দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে চাকরিতে যোগদানের অনিশ্চয়তায় থাকার পর তাঁদের সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না।
আন্দোলনের মধ্যেই বেলা ১১টার দিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেখানে জানানো হয়, ‘সহকারী শিক্ষক নিয়োগ–২০২৫’-এ চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের আগামী ১ অক্টোবর চাকরিতে যোগদান করতে হবে। এই ঘোষণায় আন্দোলনকারীদের মধ্যে আনন্দের পরিবেশ তৈরি হলেও নতুন একটি জটিলতা সামনে আসে। কারণ, পদায়নের সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে ২ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়েছিল, যেদিন সরকারি ছুটি থাকায় কার্যক্রম বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।
এ কারণে আন্দোলনকারীরা নতুন করে ৪ অক্টোবর পদায়নের প্রজ্ঞাপন জারির দাবি জানান। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা শাহবাগ ছাড়বেন না বলেও ঘোষণা দেন। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত দিলে আন্দোলনকারীরা তাঁদের কর্মসূচির সফল সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
দুপুরের দিকে দাবি পূরণের নিশ্চয়তা পাওয়ার পর আন্দোলনকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, আদালতের জটিলতা এবং অপেক্ষার পর অবশেষে চাকরিতে যোগদানের পথ সুগম হওয়ায় অনেককে আবেগাপ্লুত হতে দেখা যায়। কর্মসূচি শেষ করে তাঁরা শাহবাগের সড়ক পরিষ্কার করেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে এলাকা ত্যাগ করেন।
দীর্ঘ সময় পর রাজধানীর শাহবাগে এমন একটি আন্দোলন সফলভাবে শেষ হওয়ায় এটি অন্য আন্দোলনের তুলনায় ব্যতিক্রম হিসেবে আলোচনায় এসেছে। দাবি আদায়ের পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান, পুলিশের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ এবং শেষ পর্যন্ত সমাধানে পৌঁছানোর ঘটনাটি দিনটির অন্যতম ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


