ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধে নতুন করে আলোচনায় এসেছে নেপাল। নতুন এক রুপির মুদ্রা থেকে বিতর্কিত ‘বৃহত্তর নেপাল’ মানচিত্র সরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও শেষ পর্যন্ত সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে কাঠমান্ডু। বিরোধী দল, জাতীয়তাবাদী সংগঠন এবং জনমতের তীব্র চাপের মুখে সরকার নতুন মুদ্রাতেও আগের রাজনৈতিক মানচিত্র বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে ভারতের কূটনৈতিক প্রত্যাশা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

শনিবার নেপালের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নেপাল রাষ্ট্র ব্যাংক (এনআরবি) নিশ্চিত করেছে, নতুন এক রুপির মুদ্রা বাজারে ছাড়া হবে। মুদ্রাটির আকার আগের তুলনায় কিছুটা ছোট এবং ওজনও কম হবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মুদ্রার নকশায় কোনো পরিবর্তন আনা হচ্ছে না। আগের মতোই সেখানে ‘বৃহত্তর নেপাল’-এর রাজনৈতিক মানচিত্র থাকবে, যেখানে ভারতের দাবি করা লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ ও কালাপানি অঞ্চলকে নেপালের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

এনআরবির মুখপাত্র গুরু প্রসাদ পাউডেল জানান, নতুন নকশার আনুষ্ঠানিক কপি এখনো হাতে না এলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিশ্চিত যে মানচিত্র অপরিবর্তিত থাকবে। তাঁর ভাষ্য, মুদ্রার ধাতব উপাদান ও আকারে পরিবর্তন এলেও রাজনৈতিক মানচিত্রে কোনো সংশোধন করা হয়নি।

ভারত ও নেপালের মধ্যে এই সীমান্ত বিরোধ নতুন নয়। প্রায় ৩৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ ও কালাপানি অঞ্চলকে কেন্দ্র করেই দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ চলছে। অঞ্চলটি উত্তরাখণ্ডের পিথোরাগড় জেলার কাছে ভারত-নেপাল-চীন ট্রাই-জংশনের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি শুধু সীমান্ত নয়, কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিরোধের মূল সূত্র ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তি। ওই চুক্তিতে কালী বা মহাকালী নদীকে দুই দেশের সীমারেখা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও নদীর প্রকৃত উৎপত্তিস্থল নিয়ে দুই দেশের ব্যাখ্যা ভিন্ন। নেপালের দাবি, নদীর উৎপত্তি লিম্পিয়াধুরা থেকে হওয়ায় সংশ্লিষ্ট তিনটি অঞ্চল তাদের সার্বভৌম ভূখণ্ডের অংশ। অন্যদিকে ভারতের দাবি, নদীর উৎস কালাপানির কাছাকাছি একটি ঝরনা। সেই যুক্তিতে অঞ্চলগুলো ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত।

২০২০ সালে বিরোধটি আবারও তীব্র আকার ধারণ করে। সে সময় ভারত ধারচুলা থেকে লিপুলেখ পাস পর্যন্ত একটি কৌশলগত সড়ক উদ্বোধন করে। ভারত এই সড়ককে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে উল্লেখ করলেও নেপাল অভিযোগ তোলে, সড়কটি তাদের দাবিকৃত ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। এরপর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির সরকার নতুন রাজনৈতিক মানচিত্র প্রকাশ করে, যেখানে কালাপানি, লিপুলেখ ও লিম্পিয়াধুরাকে আনুষ্ঠানিকভাবে নেপালের অংশ হিসেবে দেখানো হয়। পরবর্তীতে সেই মানচিত্র দেশটির সংসদে অনুমোদন পেয়ে সংবিধানসম্মত স্বীকৃতি লাভ করে এবং সরকারি নথিপত্র ও প্রচলিত মুদ্রায় স্থান পায়।

ভারত শুরু থেকেই এই মানচিত্রের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। নয়াদিল্লির দাবি, একতরফাভাবে সীমান্ত পরিবর্তনের কোনো প্রচেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয় এবং সীমান্তসংক্রান্ত বিরোধ কেবল দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান হতে পারে।

এরই মধ্যে ২০২৫ সালে রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন বালেন্দ্র শাহ। কাঠমান্ডুর জনপ্রিয় মেয়র থেকে জাতীয় রাজনীতিতে উঠে আসা এই নেতা দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা শুরু করেন। অর্থনীতি, বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতা এবং সীমান্ত সংযোগকে অগ্রাধিকার দিয়ে তিনি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার বার্তা দেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে ইতিবাচক বার্তা পাঠান।

একই সময়ে নেপাল চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করছে। তবে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্পে উচ্চ সুদের ঋণের পরিবর্তে অনুদানভিত্তিক সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতিও গ্রহণ করেছে বর্তমান সরকার। ফলে ভারত ও চীনের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখার চেষ্টা করছে কাঠমান্ডু।

ক্ষমতায় আসার পর বালেন্দ্র সরকার ভারত ও চীনকে লিপুলেখ গিরিপথ ব্যবহার করে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রা আয়োজন না করার আহ্বানও জানায়। নেপালের দাবি, ওই গিরিপথ তাদের ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত। তবে ভারত জানিয়ে দেয়, ১৯৫৪ সাল থেকেই ওই পথ ব্যবহার করে তীর্থযাত্রা পরিচালিত হচ্ছে এবং সীমান্ত ইস্যু কেবল দুই দেশের আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব। পরে নেপাল যখন লিপুলেখ ইস্যুতে চীন ও ব্রিটেনের সঙ্গে আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করে, তখন ভারত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, এ ধরনের দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে তৃতীয় পক্ষের কোনো হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়।

এমন পরিস্থিতিতে গত ২০ জুলাই নেপাল সরকার এক রুপির নতুন মুদ্রায় বিতর্কিত রাজনৈতিক মানচিত্রের পরিবর্তে মুস্তাং জেলার ঐতিহাসিক ‘লো ঘিয়াকার মঠ’-এর ছবি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেয়। তখন অনেকেই ধারণা করেছিলেন, এটি ভারত-নেপাল সম্পর্কের উত্তেজনা কমানোর একটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ। যদিও সরকার দাবি করেছিল, এটি কেবল নিয়মিত মুদ্রা সংস্কারের অংশ এবং এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য জড়িত নয়।

কিন্তু সরকারের এই সিদ্ধান্ত দেশটির ভেতরেই ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ তোলে, জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ভারতকে খুশি করার চেষ্টা করছে সরকার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলো সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং বিতর্কিত মানচিত্র বহাল রাখার দাবি জানায়।

শেষ পর্যন্ত জনমতের চাপের মুখে সরকার আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। ফলে নতুন এক রুপির মুদ্রাতেও আগের মতো ‘বৃহত্তর নেপাল’-এর রাজনৈতিক মানচিত্রই বহাল রাখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি মুদ্রার নকশা সংক্রান্ত নয়; বরং এটি সীমান্ত বিরোধে নেপালের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকার স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা। একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দিল, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এবং জাতীয়তাবাদী আবেগের সামনে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কৌশলও অনেক সময় পরিবর্তিত হতে পারে।

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version