রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩, ২৫ সফর ১৪৪৮

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করে জাদুঘরের প্রদর্শনীতে থাকা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, জাদুঘরের বর্তমান প্রদর্শনীতে সীমান্ত হত্যাকাণ্ড, ভারতবিরোধী আন্দোলন এবং গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও অংশগ্রহণকারীদের যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। এ সময় তিনি মন্তব্য করেন, বিএনপি হয়তো ভারতকে ভয় পাচ্ছে।

শনিবার সকালে এনসিপির অর্ধশতাধিক নেতাকে সঙ্গে নিয়ে রাজধানীর গণভবনকেন্দ্রিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শনে যান নাহিদ ইসলাম। জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক নেতাকর্মীও তাঁর সঙ্গে ছিলেন। সকাল নয়টার দিকে জাদুঘরে প্রবেশের পর বিভিন্ন প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন তাঁরা। পরে প্রায় আধা ঘণ্টা জাদুঘর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেন নাহিদ ইসলাম।

জাদুঘরের কিছু উপাদান সরিয়ে ফেলা হয়েছে অভিযোগ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, আগে এখানে সীমান্ত হত্যার একটি আলাদা অংশ ছিল। সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফের হাতে নিহত ব্যক্তিদের একটি তালিকা এবং ফেলানী হত্যাকাণ্ডের একটি ভাস্কর্যও ছিল বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ, বর্তমানে এসব উপাদান আর জাদুঘরে নেই।

তিনি আরও বলেন, মোদিবিরোধী আন্দোলনের কিছু স্মৃতি ও ছবি আগে জাদুঘরের প্রদর্শনীতে ছিল। সেগুলোও সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপি হয়তো ভারতকে ভয় পাচ্ছে। তাঁর প্রশ্ন, যদি ভয় না থাকে, তাহলে ইতিহাসের অংশ হিসেবে থাকা বিষয়গুলো জাদুঘরে থাকবে না কেন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পর নাহিদ ইসলাম বর্তমানে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন। জাদুঘর পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তিনি এই জাদুঘরের কার্যক্রম পরিদর্শন করতে এসেছিলেন। সে সময় বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এবং সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসও সেখানে ছিলেন বলে জানান তিনি।

নাহিদ ইসলামের ভাষ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাদুঘর নিয়ে যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, পরবর্তী সরকার এসে তাতে কিছু পরিবর্তন করেছে। তাঁর মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে জাদুঘরের উপস্থাপনায় আরও বিস্তৃত ও ভারসাম্যপূর্ণ ইতিহাস তুলে ধরা প্রয়োজন।

তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমানে জাদুঘরে বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসেবে যে নির্যাতনের শিকার হয়েছে, সে-সংক্রান্ত কনটেন্টের পরিমাণ বেড়েছে। পাশাপাশি দলীয় বক্তব্য ও বয়ানও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে জাদুঘরকে একটি চলমান ও হালনাগাদ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা উচিত বলেও মত দেন নাহিদ।

জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাস কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সে বিষয়ে কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রস্তাবও দেন তিনি। তাঁর মতে, জাদুঘরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনাগুলো আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে বোঝাতে একটি পূর্ণাঙ্গ টাইমলাইন থাকা উচিত। এতে আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়, গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং অংশগ্রহণকারীদের ভূমিকা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।

বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ভূমিকা আলাদাভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, এসব শিক্ষার্থীর ভূমিকা বর্তমান প্রদর্শনীতে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। একইভাবে ঢাকার বাইরের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন জেলায় সংঘটিত আন্দোলনের ঘটনাগুলোও জাদুঘরে আরও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

নাহিদ বলেন, শুধু পরিচিত মুখগুলোকে বারবার সামনে না এনে আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ভূমিকা তুলে ধরা প্রয়োজন। তাঁর মতে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আন্দোলনের সময় নির্যাতন, নির্মমতা এবং প্রতিরোধের আলাদা আলাদা ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনাও জুলাই অভ্যুত্থানের সামগ্রিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং সেগুলো জাদুঘরের প্রদর্শনীতে যুক্ত হওয়া প্রয়োজন।

জাদুঘরের ব্যবস্থাপনা নিয়েও কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি মনে করেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরকে স্বায়ত্তশাসিত করা উচিত। তাঁর মতে, অতীতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দলীয়ভাবে উপস্থাপনের অভিযোগ ছিল এবং সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে পাঠ্যপুস্তক ও ইতিহাসের উপস্থাপনাতেও পরিবর্তন এসেছে। একই ধরনের পরিস্থিতি যাতে জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাসের ক্ষেত্রে না ঘটে, সে জন্য জাদুঘরের একটি জাতীয় চরিত্র থাকা প্রয়োজন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানসংক্রান্ত ইতিহাস, বক্তব্য ও প্রদর্শনীতে যেন প্রকৃত ঘটনাগুলো উঠে আসে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পুরো ইতিহাসকে ব্যাখ্যা না করে ঘটনাগুলোর বাস্তব চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

এদিকে জাদুঘরে দর্শনার্থীর চাপ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন নাহিদ। তাঁর মতে, বর্তমানে বিপুলসংখ্যক মানুষ জুলাই জাদুঘর দেখতে আসছেন। কিন্তু সেই চাপ সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা জাদুঘরের বর্তমান কাঠামোয় নেই। পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

জাদুঘর পরিচালনার ক্ষেত্রে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সরাসরি অংশ নেওয়া এবং অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করা ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করার পক্ষেও মত দেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর মতে, আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি জাদুঘরের ব্যবস্থাপনা এবং প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পরিদর্শনকালে নাহিদ ইসলামের সঙ্গে এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন ও নুসরাত তাবাসসুম, কেন্দ্রীয় নেতা সারজিস আলম, সারোয়ার তুষার, এস এম সাইফ মোস্তাফিজ, মাহিন সরকারসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। জাতীয় যুবশক্তি ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতারাও এ সময় সঙ্গে ছিলেন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সেই সময়ের ইতিহাস তুলে ধরার ক্ষেত্রে জাদুঘরটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সেখানে কোন ঘটনা, কার ভূমিকা এবং কোন প্রেক্ষাপট কীভাবে উপস্থাপন করা হবে—এ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও অব্যাহত রয়েছে। নাহিদ ইসলামের সাম্প্রতিক পরিদর্শন ও মন্তব্য সেই বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version