জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি—একনেকের সভায় ৯ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ের ১০টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি নতুন এবং চারটি সংশোধিত প্রকল্প। তবে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের জন্য দুটি প্রোডাক্ট অয়েল ট্যাংকার কেনার প্রায় ১ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকার প্রকল্পটি অনুমোদন না দিয়ে আরও পর্যালোচনার জন্য ফেরত পাঠানো হয়েছে।
বুধবার শেরেবাংলা নগরের পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি সম্মেলনকক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও একনেকের চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে একনেকের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।
অনুমোদিত ১০ প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে দেওয়া হবে ৮ হাজার ৪৮৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা। আর প্রকল্প ঋণ হিসেবে থাকছে ৯৩৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।
সভায় উন্নয়ন ও সংস্কারের পাঁচ বছরের কৌশলপত্রের মোড়কও উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী।
তবে অয়েল ট্যাংকার কেনার প্রকল্পটি সভায় অনুমোদন না পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আলাদা করে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের জন্য দুটি প্রোডাক্ট অয়েল ট্যাংকার কেনার এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি সভা শেষে সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় চারটি অয়েল ট্যাংকার কেনার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। ফলে বর্তমানে একনেকে ওঠা দুটি ট্যাংকার কেনার প্রকল্পের সঙ্গে আগের সমঝোতার কোনো দ্বৈততা আছে কি না, সেটি যাচাই করা হবে। এরপর প্রকল্পটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অর্থাৎ প্রকল্পটি বাতিল হয়নি; বরং নতুন করে পর্যালোচনার জন্য ফেরত পাঠানো হয়েছে। চীন থেকে চারটি ট্যাংকার কেনার পরিকল্পনা এবং প্রস্তাবিত দুটি ট্যাংকারের প্রকল্পের মধ্যে সমন্বয় কতটা প্রয়োজন, সেটিই এখন পর্যালোচনার মূল বিষয়।
একইভাবে প্রায় ৫৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ের তুরাগ নদ সুরক্ষা ও সংরক্ষণ প্রকল্পটিও একনেকে অনুমোদন পায়নি। ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসন এবং নদী সুরক্ষার উদ্দেশ্যে নেওয়া এই প্রকল্পটি আরও বিস্তৃত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, শুধু তুরাগ নদ রক্ষার পরিবর্তে তুরাগ থেকে বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত একটি সমন্বিত প্রকল্প নেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। অর্থাৎ নদী রক্ষা কার্যক্রমকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে একনেকে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ব্যবহার অনুপযোগী স্থাপনা প্রতিস্থাপন ও পুনর্নির্মাণের প্রকল্প। পাশাপাশি দেশের ১০টি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন ১৯টি হোস্টেল ভবন নির্মাণের প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে।
সড়ক খাতেও নেওয়া হয়েছে একাধিক উদ্যোগ। বাংলাদেশে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীন সেতুগুলোর স্মার্ট রক্ষণাবেক্ষণ প্রযুক্তির সক্ষমতা উন্নয়নের প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। পাশাপাশি গ্রাম সড়ক পুনর্বাসন ও শক্তিশালী করার প্রকল্পও রয়েছে অনুমোদিত তালিকায়।
নদীভাঙন ও উপকূলীয় সুরক্ষার ক্ষেত্রেও দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। লালমনিরহাট সদর উপজেলা ধরলা নদীর ডান তীরের ভাঙন থেকে রক্ষার জন্য একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। আর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট পর্যন্ত উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালী করার প্রকল্পও অনুমোদিত হয়েছে।
জামালপুরের মাদারগঞ্জে ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনও অনুমোদন পেয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে ডেসকোর আওতাধীন এলাকায় বৈদ্যুতিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের প্রথম সংশোধনও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এর বাইরে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বাড়ানোর একটি প্রকল্প এবং রামু সেনানিবাসের অবকাঠামো উন্নয়নের প্রকল্পও একনেকের অনুমোদন পেয়েছে।
একনেকের এই বৈঠকে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, সড়ক, নদীভাঙন প্রতিরোধ, উপকূলীয় সুরক্ষা ও প্রাণিসম্পদ খাতে বিনিয়োগের চিত্র উঠে এসেছে।
তবে অয়েল ট্যাংকার এবং তুরাগ নদ সুরক্ষা প্রকল্পের ক্ষেত্রে সরকার যে সরাসরি অনুমোদন না দিয়ে আরও পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে প্রকল্প গ্রহণে সমন্বয় ও বৃহত্তর পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
এখন অয়েল ট্যাংকার কেনার ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে হওয়া সমঝোতার সঙ্গে প্রস্তাবিত প্রকল্পের সামঞ্জস্য যাচাই এবং তুরাগ-বুড়িগঙ্গা নদীপথকে ঘিরে আরও সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরির পরই এই দুটি প্রকল্পের পরবর্তী সিদ্ধান্ত আসবে।



