পানামা খাল আবারও নতুন এক সংকটের মুখে। মাত্র দুই বছর আগেই ভয়াবহ খরার কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল সীমিত করতে হয়েছিল। এবার প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো নতুন করে খালের পানির উৎসগুলোকে চাপে ফেলছে। এর ফলে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ, বিকল্প দীর্ঘ রুট এবং বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রায় ৭৭ কিলোমিটার দীর্ঘ পানামা খাল আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে জাহাজ চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। বিশ্ববাণিজ্যের জন্য এর গুরুত্ব এতটাই বেশি যে, এখানে সামান্য বিঘ্নও পণ্য পরিবহন, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের খরচে প্রভাব ফেলতে পারে।
২০২৩-২৪ সালের ভয়াবহ খরার সময় পানামা খালে জাহাজ পারাপার প্রতিদিন ২২টিতে নামিয়ে আনতে হয়েছিল। তখন নির্দিষ্ট সময়ে খাল পার হওয়ার সুযোগ পেতে কোনো কোনো জাহাজকে নিলামে লাখ লাখ ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়েছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রতিদিন ৩৪ থেকে ৩৫টি জাহাজ চলাচল করেছে।
কিন্তু এবার আবারও সেই স্বাভাবিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পানামা খালের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো, এর কার্যক্রমের জন্য প্রচুর মিঠাপানি প্রয়োজন। সুয়েজ খালের মতো শুধু সমুদ্রের পানির ওপর নির্ভর করে এটি পরিচালিত হয় না। জাহাজকে এক স্তর থেকে অন্য স্তরে ওঠানো-নামানোর জন্য গাতুন ও আলাহুয়েলা হ্রদের পানি ব্যবহার করা হয়। প্রতিটি জাহাজ খাল পার হওয়ার সময় এসব জলাধার থেকে বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহৃত হয়।
তাই বৃষ্টিপাত কমে গেলে সরাসরি সংকটে পড়ে খালের কার্যক্রম।
এবার সেই আশঙ্কাই তৈরি হয়েছে এল নিনোর কারণে।
এল নিনো হচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুচক্র। এর প্রভাব শুধু প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না; বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
পানামার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এল নিনোর কারণে পানামায় বৃষ্টিবাহী বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হলে খালের প্রধান জলাধারগুলোতে পানির সরবরাহ কমে যেতে পারে। ফলে পানির মজুত রক্ষায় কর্তৃপক্ষকে জাহাজ চলাচলের সংখ্যা কমাতে হতে পারে।
ইতিমধ্যে পানামায় তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাত নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মে, জুন ও জুলাই—এই তিন মাসে দেশটির মাসিক গড় তাপমাত্রা রেকর্ড বা রেকর্ডের কাছাকাছি ছিল। একই সময়ে দেশের বেশির ভাগ এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টিপাতও কম হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে পানামা খাল কর্তৃপক্ষ জাহাজ চলাচলের সীমা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী ৪ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩৪টি জাহাজ পার হতে পারবে। এরপর ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে এই সংখ্যা আরও কমিয়ে ৩২টি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এল নিনো দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। পানির স্তর আরও কমে গেলে জাহাজ চলাচলের সীমা ভবিষ্যতে আরও কমানোর প্রয়োজন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এর প্রভাব ইতিমধ্যে জাহাজ চলাচলের খরচে দেখা যাচ্ছে। পানামা খাল দিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পার হওয়ার সুযোগ পেতে কিছু জাহাজকে নিলামে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু জাহাজ বাণিজ্যিক প্রয়োজন মেটাতে ১০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ দিয়েছে বলে খাল কর্তৃপক্ষও স্বীকার করেছে।
যেসব জাহাজ অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে দ্রুত পার হওয়ার সুযোগ নিতে পারছে না, তাদের সামনে বিকল্প পথ বেছে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকছে না।
এর একটি বড় উদাহরণ হলো আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে যাওয়া। এশিয়াগামী কিছু গ্যাসবাহী জাহাজ ইতিমধ্যেই পানামা খালের পরিবর্তে কেপ অব গুড হোপ হয়ে দীর্ঘ পথে যাচ্ছে। এতে সময় এবং জ্বালানি—দুই খরচই বাড়ছে।
উদাহরণ হিসেবে, হিউস্টন থেকে জাপানগামী বড় গ্যাসবাহী একটি ট্যাংকার পানামা খাল ব্যবহার করলে প্রায় ২৬ দিনে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু কেপ অব গুড হোপ ঘুরে গেলে সময় লাগে প্রায় ৪৫ দিন। অর্থাৎ একটি বিকল্প রুট বেছে নিতেই প্রায় তিন সপ্তাহ অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হচ্ছে।
দীর্ঘ এই যাত্রার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অতিরিক্ত জ্বালানি, ক্রু ও পরিচালন ব্যয়। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়তে পারে পণ্যের সরবরাহ ও পরিবহন খরচের ওপর।
এদিকে পানামা কর্তৃপক্ষ দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের কথাও ভাবছে। রিও ইন্দিও এলাকায় নতুন জলাধার নির্মাণের পরিকল্পনা বিবেচনায় রয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, এই জলাধার নির্মাণ করা গেলে পানামার অর্ধেকের বেশি মানুষের পাশাপাশি পানামা খালের কার্যক্রমের আগামী ৫০ বছরের পানির চাহিদা মেটানো সম্ভব হতে পারে।
তবে এই পরিকল্পনা নিয়ে পরিবেশগত উদ্বেগও রয়েছে। পরিবেশবাদীদের কেউ কেউ নতুন জলাধার নির্মাণের পরিবর্তে বিদ্যমান পানির উৎস ব্যবহার ও বিকল্প পানি ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে এবার পানামা খালের সংকট শুধু একটি দেশের জলসম্পদের সমস্যা নয়। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালিতে অনিশ্চয়তা এবং একই সময়ে পানামা খালে পানির সংকট—বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে একসঙ্গে চাপ তৈরি করছে।
আর এল নিনো যদি পূর্বাভাস অনুযায়ী আরও শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে পানামা খালে জাহাজ চলাচলের সীমাবদ্ধতা বাড়তে পারে। এর ফলে বিকল্প দীর্ঘ রুটে জাহাজ চলাচল, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা আরও জোরালো হচ্ছে।


