ভারতের কলকাতার একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার আলিমুজ্জামান সাজুর মরদেহ দেশে পৌঁছেছে। শনিবার দুপুরে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে প্রবেশ করে। পরে স্বজনেরা মরদেহ গ্রহণ করে অ্যাম্বুলেন্সে করে কালীগঞ্জ উপজেলার বরেয়া গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে তাঁকে দাফনের প্রস্তুতি চলছে।
সাজুর মরদেহ দেশে আসার খবর পেয়ে সকাল থেকেই ভোমরা স্থলবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা। দুপুরের দিকে সেখানে ছোট ভাই মাহমুদুল হাসান দিপুসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে মরদেহের অপেক্ষায় দেখা যায়।
ভোমরা স্থলবন্দর ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সজীব বালা জানান, ভারতের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে মরদেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগে। পরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর স্বজনেরা মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন।
সাজুর মরদেহ গ্রহণ করতে ভোমরা স্থলবন্দরে উপস্থিত ছিলেন তাঁর ছোট ভাই দিপু, ফুফাতো ভাই উজ্জ্বল, মিথুনসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। তবে বড় ভাই সাহেব সরদার সেখানে যাননি। তিনি গ্রামের বাড়িতে থেকে কবর খননসহ দাফনের আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি তদারক করছিলেন।
কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের কর্মকর্তা ওমর ফারুক আকন্দ জানান, কলকাতার অগ্নিকাণ্ডে নিহত বাংলাদেশি নাগরিকদের মরদেহ দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে উপহাইকমিশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর মরদেহ হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হয়।
তবে সাজুর মরদেহ দেশে ফিরলেও একই অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাতক্ষীরার আরেক বাসিন্দা রেবতী সরকারের শেষকৃত্য হয়েছে কলকাতাতেই।
কালীগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা রেবতী সরকারও ওই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান। পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁর মরদেহ দেশে না এনে কলকাতাতেই সৎকার করা হয়েছে।
রেবতীর ছেলে অনিক সরকার জানান, তিনি ভারতের উত্তরাখণ্ডে তাঁর দাদা-দাদির কাছে ছিলেন। মায়ের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর শুক্রবার ট্রেনে কলকাতায় পৌঁছান। পরে তাঁর বাবাও কলকাতায় যান। এরপর পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শুক্রবার রাত সাড়ে তিনটার দিকে কলকাতার নিমতলা শ্মশানে রেবতীর সৎকার সম্পন্ন করা হয়।
বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের কর্মকর্তা ওমর ফারুক আকন্দ জানান, রেবতীর পরিবারের ইচ্ছা অনুযায়ী ভারতে তাঁর সৎকার সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হয়েছে। একই সঙ্গে কলকাতার অগ্নিকাণ্ডে নিহত বাংলাদেশি নাগরিকদের মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রয়োজনীয় ব্যয় সরকার বহন করেছে বলেও জানান তিনি।
গত ১৯ আগস্ট ভোরে কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইন আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ আগুন লাগে। গভীর রাতে হোটেলে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় অনেক অতিথি আটকা পড়েন। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজনকে উদ্ধার করলেও প্রাণ হারান নয়জন। তাঁদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন।
এই অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই নিহত বাংলাদেশিদের পরিচয় ও মরদেহ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ শুরু করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে সাতক্ষীরার সাজু ও রেবতী সরকার ছাড়াও কুষ্টিয়ার চারজন এবং ঢাকার একজন রয়েছেন।
নিহতদের মরদেহের মধ্যে কয়েকজনের মরদেহ শনিবার যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে দেশে ফেরার কথা রয়েছে। একে একে প্রিয়জনের মরদেহ দেশে ফিরছে, আর স্বজনদের বাড়িতে চলছে শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি।
সাজুর পরিবারের জন্য শনিবারের দিনটি তাই ছিল একসঙ্গে স্বস্তি ও শোকের। দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রিয়জনের মরদেহ বাড়িতে ফিরেছে, কিন্তু সেই ফেরার সঙ্গে এসেছে চিরবিদায়ের বাস্তবতা। গ্রামের বাড়িতে চলছে দাফনের প্রস্তুতি, স্বজনদের মধ্যে চলছে শোকের মাতম।
অন্যদিকে রেবতী সরকারের পরিবারকে শেষ বিদায় জানাতে হয়েছে কলকাতার মাটিতেই। তাঁর ছেলে মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে ছুটে গেছেন কলকাতায়। সেখানেই সম্পন্ন হয়েছে শেষকৃত্য।
একই দুর্ঘটনা, কিন্তু দুই পরিবারের শেষ বিদায়ের পথ ভিন্ন। একজনের মরদেহ ফিরেছে সাতক্ষীরার গ্রামের বাড়িতে, অন্যজনের শেষ ঠিকানা হয়েছে কলকাতার শ্মশান।
কলকাতার সেই অগ্নিকাণ্ড এখন তাঁদের পরিবারের কাছে আর শুধু একটি দুর্ঘটনার খবর নয়। এটি হয়ে উঠেছে প্রিয় মানুষ হারানোর গভীর শোক, অপেক্ষা আর অপূরণীয় ক্ষতির স্মৃতি।


