ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ওষুধ ও নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমের পাশাপাশি খাদ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত এই রোগে খাবারের ধরন ও পরিমাণে পরিবর্তন আনতে হয়। তবে ডায়াবেটিস রোগীদের কী খাওয়া উচিত, কী খাওয়া উচিত নয়—এসব নিয়ে সমাজে বেশ কিছু ভুল ধারণাও প্রচলিত রয়েছে। এসব ধারণা অনুসরণ করতে গিয়ে অনেক সময় রোগীরা অপ্রয়োজনীয়ভাবে কিছু খাবার বাদ দেন কিংবা এমন খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করেন, যা দীর্ঘ মেয়াদে সমস্যার কারণ হতে পারে।
ডায়াবেটিস নিয়ে বহুল প্রচলিত একটি ধারণা হলো, কিটো ডায়েট অনুসরণ করলে রোগটি সেরে যাবে। কিন্তু ডায়াবেটিস একটি জীবনব্যাপী রোগ। কিটো ডায়েটে শর্করার পরিমাণ অত্যন্ত কম থাকায় অনেক ক্ষেত্রে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে। তবে দীর্ঘ সময় এ ধরনের খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করলে শরীরে গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কিটোজেনিক ডায়েটে সাধারণত প্রায় ৭০ শতাংশ ফ্যাট এবং ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ প্রোটিন থাকে। দীর্ঘদিন এমন খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করলে বিপাকক্রিয়ায় সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং লিভার ও কিডনির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তাই শুধু রক্তে শর্করার মাত্রা কমানোর উদ্দেশ্যে নিজে থেকে দীর্ঘ মেয়াদে কিটো ডায়েট অনুসরণ করা ঠিক নয়।
আরেকটি প্রচলিত ধারণা হলো, মিষ্টি খাওয়ার কারণেই ডায়াবেটিস হয়। বিষয়টি এতটা সরাসরি নয়। মিষ্টিজাতীয় খাবারে সাধারণত ক্যালরি বেশি থাকে। অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণের ফলে শরীরের ওজন বাড়তে পারে এবং অতিরিক্ত ওজন ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। এভাবেই মিষ্টি ও উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার পরোক্ষভাবে ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
একজন সুস্থ-স্বাভাবিক ব্যক্তি প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম চিনি দিয়ে তৈরি খাবার খেতে পারেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে শুধু সরাসরি চিনি খেলেই শরীরে শর্করা প্রবেশ করে—এমন ধারণাও সঠিক নয়। প্রতিদিনের ভাত, রুটি ও ফলমূলের মতো বিভিন্ন খাবারেও শর্করা থাকে।
ডায়াবেটিস রোগীকে মাঝেমধ্যে মিষ্টি খেতেই হবে—এমন ধারণাও প্রচলিত রয়েছে। অনেকে মনে করেন, মিষ্টি না খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা অতিরিক্ত কমে গিয়ে হাইপোগ্লাইসিমিয়া হতে পারে। কিন্তু নিয়ম করে মিষ্টি খাওয়া হাইপোগ্লাইসিমিয়া প্রতিরোধের পদ্ধতি নয়। কারণ, প্রতিদিনের স্বাভাবিক খাবার থেকেই শরীর প্রয়োজনীয় শর্করা পায়।
তবে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে সত্যিই কমে গেলে পরিস্থিতি ভিন্ন। সে ক্ষেত্রে দ্রুত চিনি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে। নিয়মমাফিক খাবার গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহার করলে রক্তে শর্করা অতিরিক্ত কমে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
ডায়াবেটিস রোগীরা ডাল ও বীজজাতীয় খাবার খেতে পারবেন না—এটিও একটি ভুল ধারণা। বিভিন্ন ধরনের ডাল ও বীজ উদ্ভিজ্জ আমিষের উৎস। তাই প্রাণিজ আমিষের পাশাপাশি পরিমিত পরিমাণে উদ্ভিজ্জ আমিষও খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
তবে ডায়াবেটিসের পাশাপাশি কিডনির সমস্যা থাকলে খাবারের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে আমিষের পরিমাণ রোগীর অবস্থা অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হয়। তাই চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাবারের পরিমাণ ঠিক করা প্রয়োজন।
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মায়েদের নিয়েও একটি ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকের ধারণা, মায়ের ডায়াবেটিস থাকলে শিশুকে বুকের দুধ দেওয়া যাবে না। বাস্তবে ডায়াবেটিস থাকা সত্ত্বেও মা শিশুকে বুকের দুধ পান করাতে পারেন। এতে শিশুর ক্ষতি হয় না।
বরং শিশুর প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও স্বাভাবিক বিকাশের জন্য বুকের দুধ গুরুত্বপূর্ণ। অন্যান্য শিশুর মতো ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মায়ের সন্তানেরও জন্মের প্রথম ছয় মাসের পুষ্টির চাহিদা মায়ের বুকের দুধ থেকেই পূরণ হতে পারে।
সব মিলিয়ে ডায়াবেটিসের খাদ্য ব্যবস্থাপনায় প্রচলিত কথা বা ব্যক্তিগত ধারণার পরিবর্তে চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুসরণ করাই গুরুত্বপূর্ণ। কিটো ডায়েট থেকে শুরু করে মিষ্টি, ডাল-বীজ কিংবা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো—এসব বিষয়ে ভুল ধারণা রোগীর খাদ্যাভ্যাসকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল করে তুলতে পারে। ব্যক্তিভেদে বয়স, ওজন, ওষুধ, শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য রোগের ওপর ভিত্তি করে খাদ্যতালিকাও আলাদা হতে পারে।


