কুমিল্লায় নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের ১৩ বছর বয়সী ছেলের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতীম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান।
শনিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে ইশায়াতের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর কথা রয়েছে।
ইশায়াত কোটবাড়ি এলাকার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ি এলাকায় থাকত সে।
পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয় ইশায়াত। এরপর আর বাসায় ফেরেনি। পরিবারের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও একপর্যায়ে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
ফোনের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করে শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকায় সেটির অবস্থান পাওয়া যায় বলে পরিবার জানিয়েছে। এলাকাটি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি। এরপর থেকে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। ইশায়াতের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার ছেলেকে খুঁজে না পেয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।
শনিবার বেলা একটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের লালমাই সানন্দা পাহাড়ের জঙ্গলে একটি মরদেহ পড়ে থাকার খবর পায় পুলিশ। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে সেটি ইশায়াতের মরদেহ বলে শনাক্ত করা হয়। তবে কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে কিংবা কীভাবে সে ওই জঙ্গলে পৌঁছেছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ইশায়াতের সঙ্গে থাকা মায়ের আইফোনটিও পাওয়া যায়নি। এ কারণে ফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে প্রাথমিক ধারণা তৈরি হয়েছে। তবে পুলিশ এখনো হত্যার উদ্দেশ্য বা ঘটনায় কারা জড়িত, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য দেয়নি। তাই আইফোনের জন্যই তাকে হত্যা করা হয়েছে—এটি এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আবদুল হাকিম জানান, ইশায়াত নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে খুঁজে বের করতে পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
ইশায়াতের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে শোক নেমে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, ‘শুধুমাত্র একটি আইফোনের জন্য ছেলেটাকে মেরে ফেললি। এইরকম ১০টা ফোন মুক্তিপণ হিসেবে চাইতি—আমরা দিতাম।’ তবে তাঁর এই বক্তব্য ব্যক্তিগত ধারণা ও প্রতিক্রিয়া; তদন্ত শেষ হওয়ার আগে হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি পুলিশ।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঘটনার শুরু থেকেই পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে কাজ চলছে। তদন্তের অগ্রগতি অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত জানানো হবে।
এখন ময়নাতদন্ত ও পুলিশের তদন্তে ইশায়াতের মৃত্যুর সঠিক কারণ এবং ঘটনার পেছনে কারা জড়িত ছিল, তা পরিষ্কার হওয়ার অপেক্ষা। একই সঙ্গে নিখোঁজ আইফোনটির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


