ভারতের মণিপুরে জাতিগত সহিংসতায় বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য স্থাপিত ত্রাণশিবিরে একের পর এক অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। ৩৪টি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মধ্যে কেন মাত্র ২০টির ময়নাতদন্ত হয়েছে, সব ঘটনায় কেন মামলা হয়নি এবং নিহতদের পরিবারকে কেন মাত্র ২০ থেকে ৩০ হাজার রুপি ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে—এসব বিষয়ে রাজ্য সরকারের কাছে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছেন আদালত।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ মণিপুরের মুখ্য সচিবকে এ বিষয়ে একটি বিস্তারিত হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনা। একই সঙ্গে ত্রাণশিবিরে থাকা বাস্তুচ্যুত মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
২০২৩ সালে মণিপুরে শুরু হওয়া জাতিগত সহিংসতার পর বাস্তুচ্যুত মানুষের ত্রাণ ও পুনর্বাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য সাবেক বিচারপতি গীতা মিত্তলের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছিলেন সুপ্রিম কোর্ট। সেই কমিটির প্রতিবেদনের তথ্য পর্যালোচনার সময় ত্রাণশিবিরে মৃত্যুর বিষয়টি আদালতের নজরে আসে।
আদালতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মণিপুরের আটটি জেলার ত্রাণশিবিরে মোট ৬৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪টি মৃত্যুকে অস্বাভাবিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু এই ৩৪ ঘটনার মধ্যে মাত্র ২০টিতে ময়নাতদন্ত হয়েছে এবং ২৫টি ঘটনায় ফৌজদারি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। চারটি ঘটনায় বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতেই আদালত জানতে চেয়েছেন, অস্বাভাবিক হিসেবে চিহ্নিত সব মৃত্যুর ক্ষেত্রে কেন ময়নাতদন্ত করা হয়নি। যেসব ঘটনায় ময়নাতদন্ত হয়েছে, সেগুলোর প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ কী বলা হয়েছে, সেই তথ্যও রাজ্য সরকারকে জানাতে বলা হয়েছে।
ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সুপ্রিম কোর্ট। ত্রাণশিবিরে থাকা অবস্থায় অস্বাভাবিকভাবে মারা যাওয়া বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের স্বজনদের কেন মাত্র ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার রুপি দেওয়া হয়েছে, তার ব্যাখ্যা দিতে বলেছেন আদালত।
গীতা মিত্তল কমিটি এর আগে এসব মৃত্যুর বিস্তারিত তথ্য চেয়েছিল। গত ১১ জুন মণিপুরের মুখ্য সচিবের কাছে প্রথম তথ্য চাওয়া হয়। কিছু তথ্য পাওয়া গেলেও প্রয়োজনীয় বিস্তারিত না থাকায় ৪ জুলাই আবার তথ্য চায় কমিটি। এরপরও প্রয়োজনীয় তথ্য না পাওয়ার বিষয়টি আদালতের নজরে আসে।
মণিপুরের সংঘাতসংক্রান্ত মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচার কত দূর এগিয়েছে, সেটিও আদালতের পর্যবেক্ষণে রয়েছে। এর আগে সুপ্রিম কোর্ট ত্রাণশিবিরে খাদ্য ও চিকিৎসার মতো মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করা, বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসার প্রয়োজন হলে যথাযথ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
২০২৩ সালের মে মাসে মণিপুরে জাতিগত সহিংসতা শুরুর পর বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। চলতি সেপ্টেম্বরের শুরুতে মণিপুর সরকার রাজ্য বিধানসভায় জানিয়েছে, ত্রাণশিবির ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা কমে ২৮ হাজার ৮৯৯ জনে দাঁড়িয়েছে; সহিংসতার চূড়ান্ত পর্যায়ে সংখ্যাটি প্রায় ৬০ হাজার ছিল।
সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান নির্দেশের মূল লক্ষ্য এখন ৩৪টি অস্বাভাবিক মৃত্যুর প্রতিটির কারণ ও তদন্তের অগ্রগতি স্পষ্ট করা। পাশাপাশি যেসব ঘটনায় এখনো প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি, সেগুলো দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং ত্রাণশিবিরে বসবাসরত মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়েও রাজ্য প্রশাসনের কাছ থেকে জবাবদিহি চাওয়া হয়েছে।


