স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়াকে অনেকেই শুধু বার্ধক্যের সমস্যা বলে মনে করেন। কিন্তু কম বয়সেও ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বা স্মৃতিসংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনযাপনের কিছু অভ্যাস দীর্ঘ মেয়াদে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ঘুমে অবহেলা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং মন-মস্তিষ্ককে সক্রিয় না রাখার মতো বিষয়গুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের নিউরোমেডিসিন বিভাগের বিশেষজ্ঞ ডা. ইসরাত জেরিন আলমের পরামর্শ অনুযায়ী, তরুণ বয়স থেকেই মস্তিষ্কের সুস্থতার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। কারণ স্মৃতিশক্তি ভালো রাখার বিষয়টি শুধু বয়সের ওপর নির্ভর করে না; দৈনন্দিন জীবনযাপনের অভ্যাসও এতে ভূমিকা রাখে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো পর্যাপ্ত ঘুম। পড়াশোনা, চাকরি কিংবা ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে অনেক তরুণই নিয়মিত রাত জাগেন। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ সময় কাটাতে গিয়ে ঘুমের সময় কমিয়ে ফেলেন অনেকে। কারও ক্ষেত্রে অনিদ্রা কিংবা ঘুমের মধ্যে শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যাও থাকতে পারে।
প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতিদিন সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়। পর্যাপ্ত ও ভালো মানের ঘুম নতুন তথ্য শেখা এবং স্মৃতি সংরক্ষণের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি হলে মনোযোগ ও স্মৃতি প্রক্রিয়াকরণে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ঘুমের মধ্যে অতিরিক্ত নাক ডাকা বা শ্বাসপ্রশ্বাসে ব্যাঘাত, ঘুমের মধ্যে হাঁটা কিংবা অন্য কোনো অস্বাভাবিকতা থাকলেও বিষয়টি অবহেলা না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। একইভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ঘুমের ওষুধের ওপর নির্ভর করাও ঠিক নয়।
মস্তিষ্কের সুস্থতার সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসেরও সম্পর্ক রয়েছে। নিয়মিত অতিরিক্ত লাল মাংস, বেশি চর্বিযুক্ত খাবার, মাখন, পূর্ণচর্বিযুক্ত পনির, মার্জারিন, ফাস্ট ফুড ও ভাজাপোড়া খাবার খাওয়ার অভ্যাস স্বাস্থ্যকর নয়। পাশাপাশি খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত ফলমূল ও শাকসবজি না থাকাও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
খাবারে গোটা শস্যজাতীয় খাবার রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। লাল চাল, লাল আটা কিংবা অন্যান্য হোল গ্রেইনের পাশাপাশি পরিমিত বাদাম ও বীজজাতীয় খাবারও খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। অর্থাৎ মস্তিষ্কের যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু কোন খাবার বাদ দিতে হবে, তা নয়; পুষ্টিকর খাবার নিয়মিত গ্রহণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
শরীরের পাশাপাশি মন ও মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখার দিকেও গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ। বিষণ্নতা বা দীর্ঘস্থায়ী হতাশার মতো মানসিক সমস্যা দেখা দিলে তা অবহেলা না করে প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়া দরকার। একই সঙ্গে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে না পড়াও গুরুত্বপূর্ণ।
মস্তিষ্ক সক্রিয় রাখার একটি উপায় হচ্ছে নতুন কিছু শেখার অভ্যাস ধরে রাখা। বই পড়া, সৃষ্টিশীল লেখালেখি, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, রান্না কিংবা অন্দরসজ্জার মতো পছন্দের কাজের মধ্য দিয়েও শেখার প্রক্রিয়া চালু রাখা যায়। নতুন দক্ষতা অর্জন ও মানসিকভাবে সক্রিয় থাকার অভ্যাস মস্তিষ্কের জন্য ইতিবাচক।
পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং সমমনা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক মানুষের মধ্যে থেকেও কেউ সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন বোধ করতে পারেন। তাই নিজের ভালো লাগার কাজে সময় দেওয়া, আত্মবিশ্বাস ধরে রাখা এবং সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
স্মৃতিশক্তির যত্ন তাই বৃদ্ধ বয়সে গিয়ে শুরু করার বিষয় নয়। তরুণ বয়স থেকেই পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য, মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন এবং নিয়মিত নতুন কিছু শেখার অভ্যাস গড়ে তোলা মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। আর কম বয়সেই ভুলে যাওয়ার সমস্যা যদি ক্রমাগত বাড়তে থাকে বা দৈনন্দিন কাজকর্মে প্রভাব ফেলে, তাহলে শুধু জীবনযাপনের অভ্যাসকে দায়ী না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

