সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বাস্থ্য নিয়ে নানা ধরনের পরামর্শ প্রায়ই ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে একটি দাবি—প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে এক গ্লাস পানি পান করলে নাকি স্ট্রোক ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমে। কিন্তু এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং পানি পানকে কোনো বিশেষ ‘টোটকা’ হিসেবে না দেখে শরীরের স্বাভাবিক পানির চাহিদা পূরণের অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজারের এক প্রতিবেদনে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, রাতে ঘুমানোর আগে পরিমিত পানি পান শরীরকে পানিশূন্যতা থেকে রক্ষা করতে সহায়ক হতে পারে। তবে শুধু এই অভ্যাসের কারণেই স্ট্রোক বা হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
মানবদেহের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে পর্যাপ্ত পানি প্রয়োজন। শরীরে পানির ঘাটতি হলে পানিশূন্যতা তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব শরীরের বিভিন্ন স্বাভাবিক কার্যক্রমের পাশাপাশি রক্ত সঞ্চালনের ওপরও পড়তে পারে। তাই পর্যাপ্ত পানি পান নিঃসন্দেহে সুস্থ জীবনযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, পানি কখন পান করা হচ্ছে তার চেয়ে শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী সারাদিন পর্যাপ্ত পানি পান করা। শুধু রাতে ঘুমানোর আগে এক গ্লাস পানি পান করলেই সারাদিনের পানির ঘাটতি পূরণ হয়ে যায় না।
রাতে সাধারণত টানা কয়েক ঘণ্টা ঘুমানোর কারণে এ সময় পানি পান করা হয় না। এ কারণে কারও কারও জন্য ঘুমাতে যাওয়ার আগে পরিমিত পানি পান করা উপকারী হতে পারে। বিশেষ করে দিনের বেলায় পর্যাপ্ত পানি পান না হলে রাতে তৃষ্ণা অনুভূত হওয়াটা স্বাভাবিক।
কিন্তু এখান থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ঘুমানোর আগে পানি পান করলে রক্ত ‘ঘন’ হওয়া ঠেকানো যায় এবং এর মাধ্যমে স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ করা সম্ভব। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের সরাসরি দাবিকে সমর্থন করার মতো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
অর্থাৎ, রাতে পানি পান করা ভালো অভ্যাস হতে পারে, কিন্তু সেটিকে স্ট্রোক বা হৃদ্রোগ প্রতিরোধের ওষুধ বা নিশ্চিত উপায় হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।
উল্টো শোয়ার আগে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পানি পান করলেও সমস্যা হতে পারে। অতিরিক্ত পানি পান করলে রাতে বারবার প্রস্রাবের জন্য ঘুম ভেঙে যেতে পারে। নিয়মিত ঘুমে ব্যাঘাত ঘটলে ঘুমের মান কমে যেতে পারে। তাই শুধু উপকার হবে ভেবে ঘুমানোর ঠিক আগে অতিরিক্ত পানি পান করারও প্রয়োজন নেই।
হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে একটি নির্দিষ্ট টোটকার পরিবর্তে সামগ্রিক জীবনযাপনের দিকে গুরুত্ব দেওয়া বেশি প্রয়োজন। নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাবার এবং শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত পানি পান করা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে যাঁদের আগে থেকেই হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তাঁদের চিকিৎসকের দেওয়া পরামর্শ ও চিকিৎসা নিয়মিত অনুসরণ করা উচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো স্বাস্থ্য টোটকা দেখেই চিকিৎসা বা নিয়মিত ওষুধে পরিবর্তন আনা নিরাপদ নয়।
একইভাবে সবার জন্য কতটা পানি প্রয়োজন, সেটিও এক নয়। বয়স, শারীরিক পরিশ্রম, আবহাওয়া, খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক অবস্থার ওপর পানির প্রয়োজন পরিবর্তিত হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে চিকিৎসাজনিত কারণে পানি গ্রহণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনাও থাকতে পারে।
তাই রাতে তৃষ্ণা পেলে বা প্রয়োজন মনে হলে পরিমিত পানি পান করা যেতে পারে। কিন্তু ‘ঘুমানোর আগে এক গ্লাস পানি খেলেই স্ট্রোক বা হৃদ্রোগ ঠেকানো যাবে’—এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে কোনো একটি টোটকার ওপর নির্ভর না করে সারাদিন পর্যাপ্ত পানি পান এবং সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করাই গুরুত্বপূর্ণ।

