বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩, ১১ রবিউস সানি ১৪৪৮

জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ার পর চট্টগ্রামে যাতায়াত খরচের বাড়তি চাপ পড়তে শুরু করেছে সাধারণ মানুষের ওপর। মোটরসাইকেলের খরচ সামলাতে না পেরে কেউ বাসে ফিরছেন, আবার বাসে উঠেও গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। কোনো কোনো রুটে যাত্রীরা সরকারনির্ধারিত হারের চেয়েও বেশি ভাড়া চাওয়ার অভিযোগ করছেন। বুধবার চট্টগ্রাম নগরের শাহ আমানত সেতু গোলচত্বর এলাকায় এমন চিত্র দেখা গেছে।

বাঁশখালীর জলদি এলাকার বাসিন্দা আবু সালেহ একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় চাকরি করেন। তাঁর কর্মস্থল নগরের আন্দরকিল্লায়। আগে নিয়মিত মোটরসাইকেলে বাড়ি থেকে কর্মস্থলে যাতায়াত করতেন। কিন্তু অকটেনের দাম ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা হওয়ায় এখন মোটরসাইকেল ব্যবহার বন্ধ করে বাসে যাতায়াত শুরু করেছেন।

আবু সালেহ জানান, অফিসে আসা-যাওয়ায় তাঁর দুই লিটারের বেশি অকটেন প্রয়োজন হয়। নতুন দামে মোটরসাইকেলে যাতায়াত করলে প্রতিদিন প্রায় ৫০ টাকা অতিরিক্ত খরচ হতে পারে। সীমিত বেতনের মধ্যে এই বাড়তি ব্যয় সামলানো কঠিন হওয়ায় বাসে যাতায়াতের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। কিন্তু সেখানেও খরচ বেড়েছে। আগে যে বাসের টিকিটের জন্য ১২০ টাকা দিতে হতো, বুধবার সেটির দাম হয়েছে ১৩০ টাকা। যাওয়া-আসা মিলিয়ে তাঁর দৈনিক বাসভাড়া বেড়েছে ২০ টাকা।

সরকার ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেলের দাম লিটারে ১১৫ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করেছে। অর্থাৎ চার ধরনের জ্বালানি তেলের দামই লিটারে ২০ টাকা করে বেড়েছে।

এরপর বাসভাড়াও সমন্বয় করা হয়েছে। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে ডিজেলচালিত বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা হয়েছে। আন্তজেলা ও দূরপাল্লার বাস-মিনিবাসের ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ২ টাকা ৪০ পয়সা। অর্থাৎ কিলোমিটারে ১৭ পয়সা করে ভাড়া বেড়েছে। এই নতুন হার ২২ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর।

তবে শাহ আমানত সেতু এলাকায় যাত্রী ও পরিবহনশ্রমিকদের বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া রুটের কয়েকজন চালক ও সহকারী দাবি করেছেন, তাঁরা এখনো আগের ভাড়াই নিচ্ছেন। তাঁদের ভাষ্য, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতি ট্রিপে জ্বালানি ব্যয় এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এরপরও যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে না।

যাত্রীরা অবশ্য ভিন্ন অভিযোগ করছেন। চন্দনাইশের আবদুর রহমানের দাবি, আগে যে পথে ৮০ টাকা ভাড়া নেওয়া হতো, এখন সেখানে ১০০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। ২০ টাকা বেশি দিতে রাজি না হওয়ায় তিনি ওই বাসে না উঠে অন্য গাড়ির জন্য অপেক্ষা করেন।

কক্সবাজারের মহেশখালীর বাসিন্দা উজ্জ্বল দাশের অভিজ্ঞতাও একই ধরনের। শনিবার চট্টগ্রামে আসার সময় তাঁর বাসভাড়া ছিল ২৬০ টাকা। বুধবার ফেরার সময় একই যাত্রার জন্য ২৮০ টাকা দিতে হচ্ছে বলে জানান তিনি। তাঁর আশঙ্কা, দ্রব্যমূল্য ও অন্যান্য খরচের সঙ্গে যাতায়াত ব্যয় বাড়লে সীমিত আয়ের মানুষের সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

দূরপাল্লার বিভিন্ন বাস কাউন্টারেও ভাড়ার পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। টেকনাফগামী একটি বাস সার্ভিসের কাউন্টার থেকে আগে ৬৫০ টাকা নেওয়া হলেও এখন ৭৫০ টাকা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। অন্যদিকে কক্সবাজারগামী আরেকটি বাস সার্ভিসে ৪৩০ টাকার ভাড়া ৪৫০ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ অপারেটর ও রুটভেদে ভাড়া বৃদ্ধির পরিমাণেও পার্থক্য রয়েছে।

ভাড়া বাড়ার পর যাত্রী ও বাস—দুটোর সংখ্যাই কমেছে বলে স্থানীয় পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। শাহ আমানত সেতু এলাকা থেকে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক হাজার গাড়ি চলাচল করলেও এখন ৬০০ থেকে ৭০০ গাড়ি চলাচল করছে বলে কাউন্টার কর্মকর্তাদের ভাষ্য। যাত্রী কম থাকায় বুধবার অনেক কাউন্টার প্রায় ফাঁকা দেখা গেছে।

বাড়তি ভাড়া নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে বিআরটিএ চট্টগ্রামের পরিচালক শফিকুজ্জামান ভূঞা জানিয়েছেন, সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা নেওয়া হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক যাত্রী মৌখিকভাবে অভিযোগ করলেও নির্দিষ্ট গাড়ির বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। পরিস্থিতি তদারকিতে বিআরটিএর দল মাঠে রয়েছে।

নতুন সরকারি প্রজ্ঞাপনেও অনুমোদিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায় না করার কথা স্পষ্ট করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাসে নতুন ভাড়ার তালিকা দৃশ্যমান স্থানে রাখা বাধ্যতামূলক। ফলে যাত্রীরা সরকারনির্ধারিত হার দেখে ভাড়া যাচাই করতে পারবেন।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব তাই শুধু ব্যক্তিগত গাড়ি বা মোটরসাইকেলের খরচেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। বাসভাড়া ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়েও পড়তে পারে। এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারনির্ধারিত ১৭ পয়সার সমন্বয় কতটা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং নির্ধারিত হারের বাইরে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতে তদারকি কতটা কার্যকর থাকে।

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version