সকালে ঘুম থেকে উঠে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ কফিতে চুমুক দেওয়ার অভ্যাস অনেকেরই। পরিচিত ঘ্রাণ আর স্বাদে মুহূর্তেই যেন চাঙা হয়ে ওঠে শরীর-মন। কিন্তু যে কফি কয়েক মিনিটে পান করা হয়, সেটি আপনার কাপ পর্যন্ত পৌঁছাতে পাড়ি দেয় দীর্ঘ পথ। কৃষকের বাগান থেকে শুরু করে ফল সংগ্রহ, বীজ প্রক্রিয়াজাত ও বাছাই—প্রতিটি ধাপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের শ্রম।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় আড়াই কোটি পরিবার কফি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। তাদের হাত ধরেই বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ কফি উৎপাদিত হয়। এসব পরিবারের বড় একটি অংশ উন্নয়নশীল দেশের ক্ষুদ্র কৃষক। ফলে কফি শুধু বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় একটি পানীয় নয়, এটি লাখো মানুষের আয় ও জীবিকারও গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
এক কাপ কফির যাত্রা শুরু হয় কফিবাগান থেকে। কফিগাছে যে ফল ধরে, দেখতে তা অনেকটা ছোট চেরির মতো। এ কারণে ফলটি পরিচিত ‘কফি চেরি’ নামে। ফল পরিপক্ব হওয়ার পর কৃষক ও শ্রমিকেরা সেগুলো সংগ্রহ করেন। এরপর শুরু হয় কফিবিন প্রস্তুতের প্রক্রিয়া।
একটি কফি চেরির ভেতরে সাধারণত দুটি বীজ থাকে। ফল সংগ্রহের পর বাইরের খোসা ও শাঁস সরিয়ে সেই বীজ বের করা হয়। এরপর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় বীজগুলো শুকানো হয়। শুকিয়ে যাওয়ার পর বীজের ওপর থাকা অতিরিক্ত আবরণও সরিয়ে নেওয়া হয়।
এখানেই শেষ নয়। এরপর শুরু হয় বাছাইয়ের কাজ। আকার, ঘনত্ব ও গুণমান বিবেচনায় কফিবিন আলাদা করা হয়। রোগ বা পোকায় ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা নিম্নমানের বীজ এ পর্যায়ে বাদ দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়া শেষে পাওয়া সবুজাভ বীজকে বলা হয় ‘গ্রিন কফি’ বা সবুজ কফিবিন।
তবে এই সবুজ কফিবিন সরাসরি পান করার উপযোগী নয়। কফির পরিচিত রং, ঘ্রাণ ও স্বাদ পাওয়ার আগে একে আরও কয়েকটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অর্থাৎ বাগানের গাছ থেকে একটি কফি চেরি সংগ্রহ হওয়ার পর সেটি কাপে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত বহু ধাপ অতিক্রম করে।
কফি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া গ্রীষ্মমণ্ডলীয় কৃষিপণ্যগুলোর অন্যতম। প্রধান কফি উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে রয়েছে ব্রাজিল, ভিয়েতনাম ও কলম্বিয়া। অন্যদিকে কফির বড় আমদানি ও ভোক্তা বাজারের মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র।
কফির এই বিশাল বৈশ্বিক বাজারের পেছনে তাই শুধু বড় বড় ব্র্যান্ড বা কফিশপের গল্প নেই। এর একেবারে শুরুতে রয়েছেন কফিচাষি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের উৎপাদিত ফল পরবর্তী সময়ে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাছাইয়ের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে বিশ্ববাজারে পৌঁছায়।
১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কফি দিবস। কফিকে ঘিরে থাকা বিশাল উৎপাদনব্যবস্থা এবং এর সঙ্গে যুক্ত মানুষের অবদানকে নতুন করে মনে করিয়ে দেয় দিনটি। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর গৃহীত ৮০/২৪৮ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে ১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক কফি দিবস হিসেবে নির্ধারণ করে। তবে এর আগেই আন্তর্জাতিক কফি সংস্থার সদস্যরা ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কফি দিবস হিসেবে উদ্যাপনে সম্মত হয়েছিল।
তাই সকালে কিংবা কাজের ফাঁকে হাতে নেওয়া এক কাপ কফিকে শুধু একটি পানীয় হিসেবে দেখলে এর পেছনের গল্পের বড় অংশই অজানা থেকে যায়। সেই ছোট্ট কাপটির যাত্রা শুরু হয় হয়তো হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের কোনো কফিবাগানে। কৃষকের পরিচর্যা থেকে ফল সংগ্রহ, বীজ বের করা, শুকানো ও বাছাই—অসংখ্য শ্রমঘণ্টা পেরিয়েই শেষ পর্যন্ত তৈরি হয় পরিচিত কফির ভিত্তি।
পরেরবার এক কাপ কফিতে চুমুক দেওয়ার সময় তাই এর স্বাদ ও ঘ্রাণের পাশাপাশি মনে পড়তে পারে সেই দীর্ঘ যাত্রার কথাও—যে যাত্রার প্রতিটি ধাপে জড়িয়ে আছে বহু মানুষের শ্রম ও জীবিকা।



