রাজধানীতে নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিত করতে চালু হওয়া বিশেষায়িত ‘পিংক বাস’ সেবা প্রথম দিনেই দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। মঙ্গলবার সকালে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর সড়কে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি দ্রুতগামী বাসের ধাক্কায় পিংক বাসটি দুর্ঘটনার শিকার হয়। তবে এ ঘটনায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
মঙ্গলবার সকালে তেজগাঁও বিআরটিসি ডিপোতে আয়োজিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন এই বাসসেবার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। নারীদের নিরাপদ যাতায়াতের সুযোগ বাড়ানো এবং গণপরিবহনে তাদের জন্য আরও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যেই বিশেষায়িত এই সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উদ্বোধন শেষে পিংক বাসটি যাত্রীসেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে সড়কে বের হওয়ার পরই ঘটে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সড়কে চলাচলের সময় বলাকা পরিবহনের একটি দ্রুতগামী বাস পিংক বাসটিকে ধাক্কা দেয়। এতে বাসটির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। বাসে থাকা যাত্রী বা কর্মীদের মধ্যে কেউ গুরুতর আহত হয়েছেন—এমন কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি।
দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে থাকা ট্রাফিক পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখা হয়। আইনগত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পিংক বাসটিকে ধাক্কা দেওয়া বলাকা পরিবহনের বাসটিকে জরিমানা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
নারীদের জন্য বিশেষভাবে চালু করা এই বাসসেবার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি নারী চালক ও নারী কন্ডাক্টরসহ সম্পূর্ণ নারী স্টাফের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। ফলে গণপরিবহনে নারীদের জন্য আলাদা ও তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে উদ্যোগটিকে ব্যতিক্রমী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজধানীর গণপরিবহনে নারীদের নানা ধরনের ভোগান্তি, হয়রানি ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কর্মজীবী নারী, শিক্ষার্থী এবং প্রতিদিন বিভিন্ন কাজে রাজধানীতে চলাচল করা নারীদের বড় একটি অংশকে নিয়মিত গণপরিবহন ব্যবহার করতে হয়। ভিড়, অতিরিক্ত যাত্রী, আসন সংকট এবং বিভিন্ন ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণে অনেক নারীকে গণপরিবহনে চলাচলের সময় নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।
এই বাস্তবতায় নারীদের জন্য বিশেষায়িত বাসসেবা চালুর উদ্যোগকে অনেকেই ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে নারী চালক ও কন্ডাক্টর থাকায় যাত্রীদের মধ্যে নিরাপত্তার অনুভূতি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এই উদ্যোগ পরিবহন খাতে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে সেবার উদ্বোধনের দিনেই দুর্ঘটনার ঘটনা নিয়ে সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, নারীদের জন্য নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার যে উদ্দেশ্য নিয়ে বাসসেবাটি চালু করা হয়েছে, সেখানে সড়কে অন্য যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আলাদা বাস চালু করলেই নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হবে না। এর পাশাপাশি সড়কে শৃঙ্খলা, গণপরিবহনের চালকদের দায়িত্বশীল আচরণ, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং যাত্রীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষায়িত বাসের পাশাপাশি অন্যান্য গণপরিবহনেও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
উদ্বোধনের দিনেই ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা তাই নতুন সেবাটির জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। পিংক বাসকে কেন্দ্র করে নারীদের মধ্যে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা ধরে রাখতে হলে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ কর্মী, নিরাপদ পরিচালনা এবং সড়কে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
প্রথম দিনের দুর্ঘটনায় বড় কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও ঘটনাটি রাজধানীর সড়ক ব্যবস্থাপনা ও গণপরিবহনের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এখন এই বিশেষায়িত বাসসেবা কতটা নিরাপদ, নিয়মিত এবং কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়—সেদিকেই নজর থাকবে নারী যাত্রীসহ সাধারণ মানুষের।


