জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক মূলত সরকারকেন্দ্রিক ছিল। তবে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের প্রকৃত ভিত্তি হওয়া উচিত জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক। পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সামনে এগিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এসব কথা বলেন। সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বৈঠকের বিস্তারিত জানানো হয়েছে।
স্পিকার বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক বিভিন্ন সময়ে নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। ঐতিহাসিক এই সম্পর্কও সময় ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনের সঙ্গে বিভিন্ন রূপ নিয়েছে।
দেশের বিগত নির্বাচন প্রসঙ্গে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন করেছে। তিনি এসব নির্বাচনকে ‘সাজানো নির্বাচন’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশে আবার গণতন্ত্রের পথযাত্রা সুগম হয়েছে।
বৈঠকে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে ভারত সরকার আগ্রহী। জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করার মাধ্যমে দুই দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণে কাজ করার কথাও জানান তিনি।
স্পিকার ও ভারতীয় হাইকমিশনারের আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। এর মধ্যে দুই দেশের সংসদীয় প্রতিনিধিদলের সফর বিনিময়, রোহিঙ্গা সংকট ও পুনর্বাসন, ক্রীড়া এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ছিল উল্লেখযোগ্য।
এ সময় ভারতের লোকসভার স্পিকারের পক্ষ থেকে হাফিজ উদ্দিন আহমদকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান দীনেশ ত্রিবেদী। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের সংসদীয় প্রতিনিধিদলের নিয়মিত সফর বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
স্পিকারের সঙ্গে বৈঠক শেষে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ভারতীয় হাইকমিশনার।
জাতীয় সংসদ ভবনে ডেপুটি স্পিকারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, সংসদীয় কূটনীতি, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, সংসদীয় কার্যক্রমের আধুনিকায়ন এবং পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকের শুরুতেই স্থপতি লুই আই কানের নকশায় নির্মিত বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনের স্থাপত্যশৈলীর প্রশংসা করেন দীনেশ ত্রিবেদী। বাংলাদেশ ও ভারতের ঐতিহাসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দুই দেশ অভিন্ন ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও পারস্পরিক স্বার্থের বন্ধনে আবদ্ধ।
দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে সংসদীয় যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন ভারতীয় হাইকমিশনার। তাঁর মতে, দুই দেশের সংসদ সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগ, নিয়মিত মতবিনিময় এবং পার্লামেন্টের প্রতিনিধিদলের পারস্পরিক সফর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল ভারতের পার্লামেন্টকে আধুনিক পার্লামেন্ট হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশও ই-পার্লামেন্ট ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়নে ভারতের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন তিনি।
দীনেশ ত্রিবেদীর একজন অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালনকে সংসদীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রে সুযোগ হিসেবেও দেখছেন ডেপুটি স্পিকার। বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং দুই দেশের সংসদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে তিনি সেতুবন্ধ হিসেবে ভূমিকা রাখবেন বলে আশা প্রকাশ করেন কায়সার কামাল।
বৈঠকে উভয় পক্ষ জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা, সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ এবং পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস আরও সুদৃঢ় করার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে।
পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন দীনেশ ত্রিবেদী। গণতন্ত্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গণতন্ত্রে আলোচনার কোনো শেষ নেই; এটি বহমান নদীর মতো এবং এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ভারতীয় হাইকমিশনার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার বলে মন্তব্য করেন। তারেক রহমানকে ‘অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও জনবান্ধব’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সিদ্ধান্তটি প্রধানমন্ত্রীর ওপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে দুই পক্ষের সদিচ্ছা জনবান্ধব হলে ইতিবাচক ফল আসবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সাক্ষাৎকালে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া, বাংলাদেশে ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

