টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি অর্জনের জন্য হাতে আর মাত্র সাড়ে তিন বছরের মতো সময়। কিন্তু ২০৩০ সালের লক্ষ্য সামনে রেখে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান বলছে, শুধু উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ নয়, সেগুলো বাস্তবায়নের সক্ষম প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, এসডিজি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৯ দেশের মধ্যে ১১০তম। বাংলাদেশের স্কোর ৬৪ দশমিক ৮৪। সূচকটির স্কোরকে সামগ্রিকভাবে ১৭টি এসডজি অর্জনের অগ্রগতির পরিমাপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
আগের বছরের প্রতিবেদনের হিসাব আরও উদ্বেগের জায়গাটি সামনে এনেছিল। সেখানে বাংলাদেশের পরিমাপযোগ্য এসডিজি অভীষ্টগুলোর মাত্র ২০ দশমিক ৮ শতাংশ লক্ষ্য অর্জনের পথে থাকার কথা বলা হয়েছিল। বিপরীতে ৩৫ দশমিক ১ শতাংশ অভীষ্টে পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাওয়ার তথ্য উঠে আসে। অর্থাৎ ২০৩০ যত এগিয়ে আসছে, নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি পিছিয়ে যাওয়া সূচকগুলো ঘুরিয়ে দেওয়ার চাপও বাড়ছে।
এই পরিস্থিতির সঙ্গে রাষ্ট্রের রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতা মিলিয়ে দেখলে আরেকটি বড় দুর্বলতা সামনে আসে। সরকারি মধ্যমেয়াদি নীতিবিবরণীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের কর রাজস্ব ছিল জিডিপির মাত্র ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। সরকার আগামী বছরগুলোতে এই হার বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
কম কর-জিডিপি অনুপাতের অর্থ হলো, অর্থনীতির আকারের তুলনায় সরকারের নিজস্ব কর আহরণের সক্ষমতা সীমিত। এর প্রভাব পড়ে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষাসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচিতে অর্থায়নের সক্ষমতার ওপর। ফলে এসডিজির মতো দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনেও অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে ব্যাংক খাতের পরিস্থিতিও বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এটি মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকা ঋণের প্রায় ৩৩ টাকাই তখন খেলাপি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ ছিল।
খেলাপি ঋণের বড় অংশ আবার অল্প কয়েকটি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত। দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১০টি ব্যাংকের কাছেই মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশের বেশি রয়েছে। এই ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা।
তবে খেলাপি ঋণের সাম্প্রতিক চিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও রয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালের জুনে খেলাপি ঋণের অনুপাত কমে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও আগে আড়ালে থাকা খেলাপি ঋণ শনাক্ত করে ব্যাংকের আর্থিক হিসাব পরিষ্কার করার প্রক্রিয়ার মধ্যেই বর্তমান চিত্রটি সামনে এসেছে।
এসডিজি, রাজস্ব আহরণ এবং ব্যাংক খাত—তিনটি আলাদা বিষয় মনে হলেও এগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে: প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। একটি রাষ্ট্র কতটা দক্ষতার সঙ্গে রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা সুশাসনের সঙ্গে আমানত ও ঋণ পরিচালনা করতে পারে এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার অর্থ কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে—এসবই শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও জবাবদিহির সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে কর-জিডিপি অনুপাত কম থাকা বা খেলাপি ঋণ বেশি থাকাকে সরাসরি এসডিজিতে পিছিয়ে থাকার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এসডিজির অগ্রগতি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য, বৈষম্য, পরিবেশ, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো ও সুশাসনসহ বহু সূচকের ওপর নির্ভর করে। টেকসই উন্নয়ন প্রতিবেদনও ১৭টি লক্ষ্য মিলিয়েই সামগ্রিক স্কোর নির্ধারণ করে।
ফলে ২০৩০ সালের আগে বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি শুধু কতগুলো উন্নয়ন লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে, তা নয়। বড় প্রশ্ন হলো—রাজস্ব সংগ্রহ থেকে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলকভাবে কাজ করতে পারছে। হাতে সময় কমে আসায় এই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাই এসডিজির বাকি পথের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠছে।

