ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘ সময় বিশদভাবে না লেখার পর আবার বিষয়টির দিকে ফিরে তাকিয়েছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকেরা। প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা এই যুদ্ধ এখন কোন অবস্থায় রয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে এর অবসান ঘটতে পারে—সেই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। সম্প্রতি কিয়েভ সফরের পর ফরেন পলিসি সম্পাদক রবি আগরওয়ালও যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তবে ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে অতীতের ভুল পূর্বাভাসগুলোর কথাও মনে রাখা প্রয়োজন। যুদ্ধ শুরুর আগে থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকেরা এমন অনেক ধারণা দিয়েছেন, যা শেষ পর্যন্ত বাস্তবতার সঙ্গে মেলেনি।
২০২২ সালে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করবেন—এমন সম্ভাবনাকে অনেকেই গুরুত্ব দিতে চাননি। তাঁদের যুক্তি ছিল, ইউক্রেনে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু করা রাশিয়ার জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত হবে এবং দীর্ঘ মেয়াদে দেশটিকে দুর্বল করে দিতে পারে।
কিন্তু সেই হিসাব পুতিনকে যুদ্ধ শুরু করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরু করে। এরপর দ্রুত যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে—এমন ধারণাও বাস্তব হয়নি। বরং সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।
যুদ্ধ নিয়ে পূর্বাভাসের ভুল শুধু শুরুর সময়েই হয়নি। পরবর্তী বিভিন্ন পর্যায়েও কখনো অতিরিক্ত আশাবাদ, আবার কখনো অতিরিক্ত হতাশা দেখা গেছে। কোনো কোনো সময়ে মনে হয়েছে, সামরিক সাফল্যের মাধ্যমে দ্রুত যুদ্ধের গতিপথ বদলে যাবে। আবার অন্য সময়ে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে একটি পক্ষের অবস্থান দ্রুত ভেঙে পড়তে পারে।
বাস্তবে যুদ্ধটি এসব সরল হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। সামরিক শক্তির পাশাপাশি অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সহায়তা, অস্ত্র উৎপাদন, জনবল, প্রযুক্তি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা—সবকিছুই এর গতিপথে ভূমিকা রাখছে।
সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহারও নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কিয়েভ সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রবি আগরওয়াল লিখেছেন, যুদ্ধ ক্রমেই আরও বেশি আকাশনির্ভর, ড্রোননির্ভর ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। তাঁর পর্যবেক্ষণে, আক্রমণাত্মক প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন নতুন ধরনের ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
এই বাস্তবতায় যুদ্ধ কীভাবে শেষ হতে পারে—সেটিই এখন সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর একটি। কারণ, সামরিক সংঘাত বন্ধ করতে হলে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি নয়, রাশিয়া ও ইউক্রেনের রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং তাদের সমর্থক দেশগুলোর অবস্থানও বিবেচনায় নিতে হবে।
একই সঙ্গে অতীতের ভুল পূর্বাভাস একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সামনে আনে। ইউক্রেন যুদ্ধের মতো দীর্ঘ ও জটিল সংঘাতের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া কঠিন। যুদ্ধের শুরু থেকে বিভিন্ন সময়ে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে, যা আগে থেকে সঠিকভাবে অনুমান করা সম্ভব হয়নি।
ফলে প্রায় পাঁচ বছর পর ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আশাবাদ কিংবা হতাশার পরিবর্তে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে। যুদ্ধের সমাপ্তির পথ খুঁজতে হলে সামরিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং সম্ভাব্য সমঝোতার ক্ষেত্রগুলোকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।


