বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩, ২২ সফর ১৪৪৮

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দুই বছর পরও আওয়ামী লীগ এবং শেখ পরিবারের বর্তমান অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে ও পরে শেখ পরিবারের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সদস্য দেশ ছাড়তে সক্ষম হলেও দলের বিপুলসংখ্যক শীর্ষ নেতা, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতারা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে নেতৃত্ব, আস্থা এবং সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে।

সরকার পতনের আগে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার মধ্যে সাবেক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের একটি ফোনালাপ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট সকালে শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তাপস বিদেশ যাওয়ার অনুমতি চাইলে শেখ হাসিনা তাঁকে যেতে বলেন। পরে জানা যায়, তিনি সিঙ্গাপুরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরে পৌঁছালেও ইমিগ্রেশন পর্যায়ে বাধার মুখে পড়েন এবং সেখান থেকেই শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

সেই সময় দেশজুড়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ৩ আগস্ট রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাখো মানুষের সমাবেশে সরকার পতনের এক দফা দাবির ঘোষণা দেওয়া হয়। একই দিনে সেনা সদরেও সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ নিয়ে আপত্তির বিষয়টি সামনে আসে। এসব ঘটনার পর সরকারকে ঘিরে অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে যায়।

পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যেই শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের অনেকেই নীরবে দেশ ত্যাগ করেন। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের অধিকাংশ বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে তাঁদের অবস্থানের ছবি ও ভিডিওও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ পেয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ছাড়ার সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা। আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সরকার পতনের কয়েক দিন আগে যুক্তরাজ্য থেকে ঢাকায় আসেন শেখ রেহানা। পরে শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারত যান এবং বর্তমানে ভারত ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে অবস্থান করছেন বলে জানা যায়। একই সময় তাঁদের সঙ্গে ছিলেন শেখ রেহানার দেবর এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক।

শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় সরকার পতনের আগেই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ভারতে গিয়ে মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। অন্যদিকে শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ তখন ভারতের নয়াদিল্লিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পরবর্তীতে তাঁকে অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে পাঠানো হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক, যিনি সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সরকার পতনের সময় থাইল্যান্ডে অবস্থান করছিলেন বলে জানা যায়। অন্যদিকে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য টিউলিপ সিদ্দিক এবং তাঁর বোন আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তী যুক্তরাজ্যেই ছিলেন।

শুধু শেখ হাসিনার সরাসরি পরিবারের সদস্যরাই নন, তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের অনেকেও দেশ ছেড়েছেন বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক সূত্রে দাবি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম, শেখ হেলাল উদ্দীন, শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল, শেখ তন্ময়, নূর-ই-আলম চৌধুরী, নিক্সন চৌধুরী, আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, সাদিক আবদুল্লাহ, শেখ ফজলে শামস পরশসহ আরও অনেকে। তাঁদের বেশির ভাগের বর্তমান অবস্থান ভারত বলে দাবি করা হয়েছে। কেউ কেউ কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা সিঙ্গাপুরেও অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন সূত্র উল্লেখ করেছে।

অন্যদিকে শেখ পরিবারের সদস্যরা দেশ ছাড়তে সক্ষম হলেও আওয়ামী লীগের বহু শীর্ষ নেতা সেই সুযোগ পাননি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় একটি অংশকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বর্তমানে কারাগারে থাকা উল্লেখযোগ্য নেতাদের মধ্যে রয়েছেন মুহাম্মদ ফারুক খান, শাজাহান খান, দীপু মনি, কামরুল ইসলাম, আহমদ হোসেন, আবদুস সোবহান গোলাপ, কাজী জাফর উল্যাহ, মো. আব্দুর রাজ্জাকসহ আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা। এছাড়া শেখ হাসিনার সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকও কারাগারে রয়েছেন।

সরকার পতনের পর গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের মধ্যে কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন কারাগারে এবং সাবেক শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরীও এই সময়ের মধ্যে মারা যান।

রাজনীতিবিষয়ক লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে পারিবারিক প্রভাব ক্রমেই বেড়েছিল এবং শেখ পরিবারের সদস্যরা রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন। তাঁর ভাষ্য, ক্ষমতার পরিবর্তনের পর সেই পরিবারের সদস্যরা নিরাপদে দেশ ছাড়তে পারলেও দলের সাধারণ নেতা-কর্মীদের বড় অংশ গ্রেপ্তার, মামলা এবং আইনি জটিলতার মুখে পড়েছেন। এতে তৃণমূল পর্যায়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সরকার পতনের পর শেখ পরিবারের অধিকাংশ সদস্য বিদেশে অবস্থান এবং একই সময়ে দলের বহু কেন্দ্রীয় নেতার কারাগারে থাকা আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক কাঠামো ও নেতৃত্বের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী দিনে দলটি কীভাবে এই সংকট মোকাবিলা করবে এবং নেতৃত্বের পুনর্গঠন করবে, সেটিই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম আলোচ্য বিষয়।

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version