ক্ষমতায় আসার ছয় মাসের মধ্যেই বিএনপির সামনে নতুন এক রাজনৈতিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—দল কি সরকারকে সহযোগিতা করছে, নাকি ধীরে ধীরে সরকারের কাঠামোর সঙ্গেই মিশে যাচ্ছে?
দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থাকার পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। এরপর দলের অনেক নেতা সংসদ সদস্য, মন্ত্রী কিংবা সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার দায়িত্বে যুক্ত হয়েছেন। এর প্রভাব পড়েছে মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতেও।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের আমানউল্লাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. বাহরুল আলমের রাজনৈতিক তৎপরতা সেই পরিবর্তনের একটি উদাহরণ। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আবারও প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। আর সে জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্যের সমর্থন নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন। ঢাকায় এলে এমপির বাসায় দেখা করা কিংবা এলাকায় এমপি এলে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এখন তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ।
শুধু বাহরুল আলম নন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের আরও অনেক নেতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কেউ এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন, কেউ সরকারি কাজের সুযোগ খুঁজছেন, আবার কেউ আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
এখানেই বিএনপির জন্য তৈরি হয়েছে সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ। কারণ দীর্ঘদিন বিরোধী রাজনীতিতে থাকা একটি দলের জন্য সরকার পরিচালনা ও দলীয় সংগঠন—এই দুই ভূমিকাকে আলাদা রাখা সহজ নয়।
বিএনপির নেতাদের বক্তব্য, সরকারে যাওয়ার অর্থ দল সরকারে ঢুকে যাওয়া নয়। দল সরকারের কার্যক্রমে সহযোগিতা করবে, কিন্তু দলীয় সংগঠনকে সরকারের সঙ্গে একীভূত করা যাবে না। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও স্বীকার করেছেন, সরকার গঠনের পর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলো দ্রুত পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়নি। তবে এখন জাতীয় সম্মেলন ও অঙ্গসংগঠন পুনর্গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
তবে মাঠের বাস্তবতা নিয়ে দলের ভেতরেই কিছুটা উদ্বেগ আছে। বিএনপির অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা এখন রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে। সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থাতেও দলের নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে দলের সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মসূচি কিছুটা কমে গেছে—এমন আলোচনা রয়েছে।
বিশেষ করে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে তৃণমূলে নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের কাছে এখন দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি স্থানীয় এমপি-মন্ত্রীদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে রাজনৈতিক সংগঠনের চেয়ে পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি গুরুত্ব পেয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে সরকার দাবি করছে, প্রথম ছয় মাস ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি শক্ত করা এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রস্তুতির সময়। সরকার ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে। পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন, ধর্মীয় নেতাদের সম্মানীসহ নির্বাচনী অঙ্গীকারের কয়েকটি কর্মসূচিও শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক পরিবেশের দিক থেকেও বর্তমান সরকারের সময় কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেছে। বিরোধী দলগুলো সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছে। গণমাধ্যমেও সরকারের নীতি ও ক্ষমতাসীনদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। নাগরিক সমাজও বিভিন্ন বিষয়ে মতামত প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছে।
তবে এখানেই সরকারের সামনে আরেকটি বড় পরীক্ষা—রাষ্ট্র সংস্কার। গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচনব্যবস্থা, প্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি জোরালো হয়েছিল। বিএনপিও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর কোন সংস্কার কত দ্রুত বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাদের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় দায়িত্ব দেওয়াকে কেউ কেউ দলীয় লোকজনকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা যোগ্য এবং রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেই কেউ অযোগ্য হয়ে যান না।
এখানে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তাদের অতীত রাজনৈতিক অবস্থান। দলটি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে দলীয়করণ ও রাজনৈতিক নিয়োগের অভিযোগ তুলেছে। তাই এখন বিএনপি সরকারের প্রতিটি নিয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও একই মানদণ্ডে বিচার করা হচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক চাপ। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাত ও রাজস্ব আদায়ের মতো বিষয়গুলোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটও জনজীবনে চাপ তৈরি করছে। জ্বালানি সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব থাকলেও সাধারণ মানুষের কাছে এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাজার ও জীবনযাত্রায়। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বড় অংশ যেহেতু মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই এসব সমস্যার সমাধান সরকারের জনপ্রিয়তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তবে বিএনপি এখন দলীয় সংগঠনকে নতুন করে সক্রিয় করার উদ্যোগ নিচ্ছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিভিন্ন অঞ্চলের নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক সাংগঠনিক বৈঠক করছেন। ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল ও শ্রমিক দলসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতৃত্ব পুনর্গঠনের প্রস্তুতিও চলছে।
অর্থাৎ বিএনপির সামনে এখন দুটি সমান্তরাল পথ। একদিকে সরকার পরিচালনা করে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, অন্যদিকে দলকে আবার মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় রাখা।
ক্ষমতায় থাকার সময় একটি রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—সরকার ও দলকে এক করে ফেলা। বিএনপির ক্ষেত্রেও সেই প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। এমপি-মন্ত্রীদের ঘিরে তৃণমূল নেতাদের বাড়তি নির্ভরতা যদি সাংগঠনিক রাজনীতিকে দুর্বল করে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে দলের ওপর।
তাই আগামী সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা শুধু সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতা নয়; বিএনপি কতটা দল হিসেবে নিজের স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখতে পারে, সেটিও। কারণ সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক দায় শেষ পর্যন্ত বিএনপিকেই নিতে হবে। আর একই সঙ্গে দলকে মাঠে সক্রিয় রাখা না গেলে ক্ষমতার কেন্দ্রের ব্যস্ততা একসময় সংগঠনের শক্তিকেই দুর্বল করে দিতে পারে।

